‘নেতারা বললেন, তোকে অভিনয় করতে হবে’: সৈয়দ হাসান ইমাম
৫০ বছরের বেশি সময় ধরে অভিনয় করেছেন সৈয়দ হাসান ইমাম। মঞ্চ, টেলিভিশন নাটক, চলচ্চিত্র—কোনো মাধ্যম বাদ যায়নি। এ ছাড়া অসংখ্য বেতার নাটকেও অভিনয় করেছেন। হাসান ইমাম পেয়েছেন স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, আজীবন সম্মাননাসহ নানা পুরস্কার।

নিজস্ব প্রতিবেদক: ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে অভিনয় করেছেন সৈয়দ হাসান ইমাম। মঞ্চ, টেলিভিশন নাটক, চলচ্চিত্র—কোনো মাধ্যম বাদ যায়নি। এ ছাড়া অসংখ্য বেতার নাটকেও অভিনয় করেছেন। হাসান ইমাম পেয়েছেন স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, আজীবন সম্মাননাসহ নানা পুরস্কার। আজ এই অভিনেতার ৯০তম জন্মদিন।
কয়েক বছর ধরে অভিনয় থেকে একেবারে দূরে আছেন। শরীরের বেঁধেছে নানা অসুখ–বিসুখ। তাই তো কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ছেলের কাছ থেকে চিকিৎসা করাচ্ছেন। অভিনয়ে ৫০ বছর পার করলেও সৈয়দ হাসান ইমাম অভিনয়ে নিয়মিত হতে চাননি। এটা পেশা হোক, তা কখনোই তাঁর মধ্যে ছিল না। সেই না চাওয়া পথেই কাটিয়ে দিলেন জীবনের ৫০ বছর। তাই তো নিজের ফেলে আসার সময়কে বিচিত্র জীবন হিসেবে মনে করেন এই নাট্যজন।
ক্যারিয়ারের শুরুতে একজন গায়কই হতে চেয়েছিলেন সৈয়দ হাসান ইমাম। ১৭ বছর বয়সে ১৯৫২ সালে অল ইন্ডিয়া ইয়ুথ উৎসবের বরীন্দ্র বিভাগে তিনি প্রথম হয়েছিলেন। তখন সবাই জানতেন তিনি ভালো রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী। গানই তাঁর সবকিছু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একসময় কঠিন অসুখ হয়। সে কারণে গান বাদ দিতে হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, ‘কখনো এক পেশায় ছিলাম না। একটা সময় ফুটবল খেলতাম। একটা সময় ক্রিকেটও খেলেছি। পড়ালেখা করেছি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। প্রথম জীবনে চাকরি করেছি দর্শনা চিনিকলে। সেখান থেকে চলে এলাম ব্যাংকে। তারপর টিভি নাটকে। তারপর সিনেমায়। আবার মঞ্চেও অনেক দিন অভিনয় করেছি। বহু বছর আগেই সিনেমা পরিচালনা করেছি। আবৃত্তি করেছি। গান করেছি। মুক্তিযুদ্ধ করেছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্দোলন করেছি। সে জন্যই বলছি, একটা বিচিত্র জীবন আমি পার করেছি। সেই জীবনটা ছিল অর্থময়।’
জীবনটাকে কীভাবে দেখেন? এমন প্রশ্নে হাসান ইমাম বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে জীবন অনেক সুন্দর। বেঁচে থাকাটা আরও সুন্দর। বেঁচে থাকার চেয়ে সুন্দর আর কিছু হতে পারে না। দেখুন, একটা বিচিত্র জীবন আমি কাটালাম। বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে এখনো বেঁচে আছি। জীবন নিয়ে ধারণা হচ্ছে মানুষের বয়স বাড়ে, মানুষ বুড়ো হয়, কিন্তু মন কখনো বুড়ো হয় না। মন চির যৌবনে থেকে যায়। এ দেশে যত মহামারি-দুর্যোগ এসেছে, সব সময়ই মাঠে গিয়ে কাজ করেছি। এখন তো বয়সের কারণে চাইলেও পারব না। তারপরও ঘরে বসে কাছের ও চেনা মানুষদের মধ্যে যাঁরা অসচ্ছল, তাঁদের সহযোগিতা করতে পারছি। এটাও কম কী। কোনো পেশা নয়, নিজেকে সব সময় একজন মানুষ মনে করি। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। জীবন মানে কেবল নিজের জন্য নয়, সব মানুষের হয়ে থাকার নামই জীবন।’
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম ষাটের দশকে চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। মুক্তি পাওয়া প্রথম সিনেমা ‘ধারাপাত’ হলেও নাম লিখিয়েছিলেন ‘জানাজানি’ চলচ্চিত্রে। এরপর অনেক চলচ্চিত্রে নায়ক হয়েছেন। টেলিভিশন নাটকে রয়েছে তাঁর বড় অবদান। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করছেন তিনি। মঞ্চে নিয়মিত অভিনয় করেছেন একসময়। এ ছাড়া বেতার নাটকেও অভিনয় করেছেন। দেশের মুক্তিযুদ্ধসহ নানা সংগ্রামে, সংকটে তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক।
জন্মদিন নিয়ে তাঁর ভাবনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘কোনো দিন জন্মদিন পালন করা হতো না। কেক কাটাও হতো না। তবে এই দিনে বাড়ির মধ্যে ভালো ভালো রান্না হতো। সবাই মিলে খেত, এই আরকি।’
ছোটবেলার স্মৃতিচারণা করে সৈয়দ হাসান ইমাম আরও বলেন, ‘আমাকে ছেলেবেলায় কেউ কিছু করতে নিষেধ করেননি। সচেতন পরিবার। আমার মামারা কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। বড় নেতা ছিলেন। কেউই আমাদের বাধা দেননি। আমি খেলাধুলা করেছি। গানবাজনা করেছি। পরে ছাত্ররাজনীতি করেছি। কলেজে গিয়ে নাটক করেছি। আমি নিজের মতো করে বাঁচতে পেরেছি, এটাই আমার সৌভাগ্য। নিজের মতো করে বাঁচতে পারার জন্য প্রথমত নিজের ইচ্ছাশক্তি লাগে। দ্বিতীয়ত, সবার সহযোগিতা। দুটিই আমি সব সময় পেয়েছি। অনেকের পরিবার তাদের সন্তানদের বাধা দেয়, নিজের মতো করে চলতে দেয় না। আমার পরিবার তা করেনি, আমরা যেটা করতে চেয়েছি, সেটাই করেছি।’
সৎভাবে জীবনযাপনের চেষ্টা করে গেছেন সৈয়দ হাসান ইমাম। তবে সে জীবন বর্ণাঢ্য হলো কি না, তা নিয়ে কখনো চিন্তা করেননি। তিনি বলেন, ‘এই জীবনে আমি কখনোই কারও কাছে মাথা নত করি নাই। আমাদের সময়টুকু খুব উত্তাল ছিল। ইংরেজবিরোধী আন্দোলন। আবার দেশভাগ। সাম্প্রদায়িকতা–হানাহানি। এ হিসেবে ৯০ বছরের জীবনটা নানা সংগ্রামে পার হয়েছে। এই জীবনে অনেক প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে। দুই বছর বয়সে বাবা মারা গেলে ছোটবেলায় মা আমাদের নিয়ে সংগ্রাম করেছেন। অর্থনৈতিক সংকট না থাকলেও আমি ও আমার বড় ভাইকে গড়ে তোলার একটা সংগ্রাম ছিল।’
ছোটবেলায় খেলোয়াড় হতে চেয়েছিলেন সৈয়দ হাসান ইমাম। চেয়েছিলেন খেলাটাই হোক পেশা। কিন্তু সেই স্বপ্ন বা চাওয়া পূরণ হয়নি। সে প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘খেলাটাকে প্রথম দিকে পেশা হিসেবে নেব ভেবেছিলাম। কিন্তু আরামবাগ নামে একটা জায়গায় খেলতে গেছিলাম। সেখানে বিহার কাঠিয়ার পুলিশের সঙ্গে খেলা ছিল। আমি একটা হাফভলি নিতে গেছি গোলের সামনে থেকে, পাশ থেকে আমাকে চার্জ করল। আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। ডান পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেল। সে সময় তো অপারেশন ভালো ছিল না। ডাক্তার বললেন, অপারেশন করলে পা বেঁকে যেতে পারে। ডাক্তার বললেন, তুই ফুটবল খেলা ছেড়ে দে। রাতে খুব কাঁদলাম। এরপর ফুটবল খেলা ছেড়ে দিলাম। ঢাকায় এসে ক্রিকেটও ছেড়ে দিলাম।’
অভিনয়ে ৫০ বছর পেরোনো সৈয়দ হাসান ইমাম অভিনয় করেছেন রাজনীতির কারণে। কলেজজীবন থেকে অভিনয়ের শুরু। সেই দিনের কথা প্রসঙ্গে হাসান ইমন বলেছিলেন, ‘কলেজে পড়ার অনেক পর অভিনয় শুরু করি। তখন কংগ্রেস ছিল ক্ষমতায়। কলেজের সংসদ নির্বাচনে ছাত্র কংগ্রেসকে পরাজিত করে ছাত্র ফেডারেশন সংসদ দখল করলাম। এই সময় যখন বার্ষিক উৎসব হবে, নাটক হবে; তখন ছেলেদের মেয়ে সাজতে হতো। আমাদের সে রকম কেউ ছিল না। তখন আমাদের নেতারা বললেন, তোকে অভিনয় করতে হবে। তোর হাইট বেশি না, দেখতে সুন্দর আছিস, মেয়ের চরিত্র করবি। বর্ধমান রাজ কলেজে পড়ছি। তখন একই সময়ে দুটি নাটক করি। একটি “মিসর কুমারী”, নারী চরিত্রে। বন্ধু বলে আরেকটা নাটকে পুরুষ চরিত্র। এরপর আমি পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করতে শুরু করি। বর্ধমানে আমার খুব নামডাক হয়।’
সৈয়দ হাসান ইমামের ছোটবেলা কেটেছে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে। তাঁর নানাবাড়ি ওখানে। দুই বছর বয়সে বাবা মারা যান। বর্ধমান টাউন স্কুল, রাজ কলেজ, পরে টেকনিক্যাল কলেজ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেন। কলেজজীবন শেষ করেই ১৯৫৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আসেন।
এমবি/এইচআর