চুয়াডাঙ্গায় জোড়া খুন ‘আমার কলিজার টুকরোদের যারা খুন করেচে, তাগের ফাঁসি চাই’
গতকাল মঙ্গলবার জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের জেরে আলোকদিয়া চুলকুনি মাঠে গ্রামের বাসিন্দা তৈয়ব আলী ও তাঁর ছেলে মিরাজ হোসেনকে (১৭) কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক: ‘আমার কলিজার টুকরোদের যারা খুন করেচে, তাগের ফাঁসি চাই। লাশের বদলে লাশ চাই। আর কিচুই চাই নে, আর কিচুতি মনে শান্তি পাব না।’ একমাত্র ছেলে ও নাতির হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আলোকদিয়া গ্রামের সত্তোরোর্ধ্ব বৃদ্ধ হালিমা খাতুন।
গতকাল মঙ্গলবার জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের জেরে আলোকদিয়া চুলকুনি মাঠে গ্রামের বাসিন্দা তৈয়ব আলী ও তাঁর ছেলে মিরাজ হোসেনকে (১৭) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। স্বজনদের অভিযোগ, নিহত তৈয়বের চাচা জহুর উদ্দিন নিজের পৈতৃক ভাগের জমি অনেক আগে বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু জহুর উদ্দিন বিষয়টি তাঁর ছেলেদের জানাননি। এখন বিক্রি করে দেওয়া জমি দখলে নিতে দুজনকে হত্যা করেছেন।
আজ বুধবার আলোকদিয়া গ্রামে নিহত দুজনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনেরা আহাজারি করছেন। শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন বাড়িতে ভিড় করছেন। নিহতের বড় বোন নাসিমা খাতুন বলেন, ‘আমার ভাই যদি খারাপ মানুষ হতো, বদলোক হতো, থালি মনকে বুঝ দিতি পারতাম। অবুঝ ছেলেটাকে নৃশংসভাবে খুন কোনোভাবেই মাইনে নিতি পারচিনে।’
নিহত তৈয়বের স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, চাচাশ্বশুর জহুর উদ্দিনের উসকানিতে চাচাতো ভাশুর হাসান আলী ও তাঁর ভাগনে রাজীব পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটান। চাচাশ্বশুর নিজের শরিকানা জমি অনেক আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু ছেলেদের জানাননি। এখন বাপের বিক্রি করে দেওয়া জমি দখলে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন হাসান আলী। গায়ের জোরে জমি দখল করতে গিয়ে দুজনকে খুন করেন। তিনি তাঁর স্বামী ও ছেলে হত্যার বিচার চান।
জোড়া খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত হাসান আলী ও তাঁর ভাগনে মো. রাজীবকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহত তৈয়ব আলীর স্ত্রী সাবিনা খাতুন বাদী হয়ে তিনজনকে আসামি করে থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় চাচাশ্বশুর জহুর উদ্দিনকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। অন্য দুই আসামি গ্রেপ্তার হলেও জহুর উদ্দিন আত্মগোপনে চলে গেছেন।
মামলার সংক্ষিপ্ত এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আসামিদের সঙ্গে পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। চার থেকে পাঁচ মাস আগে আসামি হাসান আলীর ওষুধের দোকানে নিহত তৈয়ব আলী ও তাঁর ছেলে মিরাজের বাগ্বিতণ্ডা হয়। তখন ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেন। কিন্তু জহুর উদ্দিনের প্ররোচনায় হাসান আলী ও মো. রাজীব তাঁদের হত্যার হুমকি দেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় তাঁরা হুমকি দিয়ে আসছিলেন। মঙ্গলবার সকালে তৈয়ব আলী আলোকদিয়ার মো. তুফানের চাতালে পাট শুকানোর কাজে যান। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরাজ বাবার জন্য খাবার নিয়ে সেখানে গেলে আসামিরা ধারালো অস্ত্র হাঁসুয়া দিয়ে অতর্কিতে কুপিয়ে মিরাজকে হত্যা করেন। এ সময় তৈয়ব আলী গুরুতর আহত হন। চাতালে থাকা শ্রমিকেরা মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার সময় তৈয়ব আলী মারা যান। ঘটনার সময় এলাকায় টহল পুলিশ দুই আসামিকে হাতেনাতে আটক করেন।
নিহত ও অভিযুক্ত আসামিদের বাড়ি পাশাপাশি। আজ আলোকদিয়া বাজারে গিয়ে বাড়িতে তালা ঝোলানো দেখা যায়। বাড়ির বাইরে পুলিশ সদস্যরা সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় পাহারা বসিয়েছেন। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালিদুর রহমান প্রথম আলোকে, গ্রেপ্তার দুই আসামিকে আজ দুপুরে আদালতে পাঠানো হয়েছে। পলাতক অন্য আসামিকে ধরতে অভিযান চলছে।
এমবি এইচআর