জুলাইয়ের ১ বছর, জনগণই জুলাইয়ের ধারক

আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের সময় দেশ অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ছেয়ে যায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর প্রচণ্ড নির্যাতন-নিপীড়ন চলে। করোনার সময় অনেক মানুষের উপার্জন বন্ধ হয়ে যায়।

Jul 26, 2025 - 12:05
 0  2
জুলাইয়ের ১ বছর, জনগণই জুলাইয়ের ধারক
ছবি, সংগৃহিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের সময় দেশ অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ছেয়ে যায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর প্রচণ্ড নির্যাতন-নিপীড়ন চলে। করোনার সময় অনেক মানুষের উপার্জন বন্ধ হয়ে যায়। করোনার পরে ওই পরিবারগুলো আবার অর্থনৈতিকভাবে আর স্থিতিশীল হতে পারেনি। দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত সমাজের ওপর প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়। সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তোষের কোনো সীমা ছিল না।

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে পরপর টানা তিনটি নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তো কেউ ভোট দিতেই যায়নি। নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের কোনো আগ্রহই ছিল না। বাক্‌স্বাধীনতার ন্যূনতম জায়গাও সরকার কেড়ে নিয়েছিল। সবকিছু মিলিয়ে দেশে অভ্যুত্থানের একটা পরিবেশ তৈরি হয়েই ছিল।

কোন আকাঙ্ক্ষা

গত বছরের ৫ জুন একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র বাতিল করে দেওয়া হয়। তখন আমি ছিলাম একটি ছাত্রসংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিনিধি। ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিনিধি হিসেবে আমি আন্দোলনের তদারক করছিলাম। আমাদের কর্মীরাও অংশগ্রহণ করছিল। আমার দায়িত্ব ছিল মূলত ছাত্র ফেডারেশনের কে কোন দিক থেকে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করছে, কোথায় কে কথা বলবে, কে কোন বিষয় সামনে আনবে, তা দেখাশোনা করা; আন্দোলনে আমাদের সংগঠনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ১ জুলাই যখন টানা আন্দোলন শুরু হয়, তখন মেয়েদের অংশগ্রহণ ছিল খুব কম। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হল কবি সুফিয়া কামাল হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।

২০১৮ সালে এত বড় একটা আন্দোলনের ছয় বছর পরে এসে কোনো কথাবার্তা ছাড়াই আদালতের মাধ্যমে আওয়ামী সরকার যখন পরিপত্র বাতিল করে দেয়, আমার মধ্যে তখন প্রচণ্ড অপমানবোধ কাজ করেছিল। ওই অপমানবোধটাই ছিল চালিকা শক্তি। আমিও ভাবতে শুরু করেছিলাম কোন কোন উপায়ে সংগঠিত হওয়া যায়।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে প্রথমে আমরা যুক্ত হয়েছিলাম ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী হিসেবে। কিন্তু ছাত্র ফেডারেশন তো শুধু একটা ছাত্রসংগঠন। এর বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার হলে মেয়েদের সংগঠিত করা, ক্যাম্পাসে ও ক্যাম্পাসের বাইরে বিভিন্ন কলেজে মেয়েদের সংগঠিত করতে সাহায্য করা—এসব কাজের সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম।

ঐক্য ভাঙলো কেন?

আন্দোলনের সময় সবার মধ্যে একটা অভূতপূর্ণ ঐক্য ছিল। সাধারণ ছাত্র, সবগুলো ছাত্রসংগঠন—সবার মধ্যে ছিল ঐক্য। আন্দোলনের পর বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অভিপ্রায়ই প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঐক্যবদ্ধ শক্তি আর টেকেনি। রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং ছাত্র—উভয়েরই এতে দায় আছে। ঐক্য টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে কারও তাগিদ ছিল না। আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রছাত্রীদের আত্তীকরণের জন্য বিকেন্দ্রিত উপায়ে ফোরাম গঠন করা যেতে পারত, যাতে তারা জাতি গঠনের কাজে যুক্ত হতে পারে। সে রকম কিছু হয়নি।

ছাত্ররাও তাদের বিভিন্ন ফোরাম বা সংগঠনকে আরও বেশি কেন্দ্রমুখী বা একীভূত করার চেষ্টা করতে থাকে। এ কারণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাগরিক ফোরাম তৈরি হওয়ার যে প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছিল, সেটা থমকে দাঁড়ায়। ঐক্য নষ্ট হওয়ার এটা একটা বড় কারণ। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে নিজ নিজ এজেন্ডা বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দিয়েছে।

এক বছরের অর্জন

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশি অধিকারসচেতন ও সরব। দীর্ঘ ১৭ বছর আমরা স্বৈরতন্ত্রের শাসনে ছিলাম। আওয়ামী লীগের পতনের আন্দোলন পার হয়ে এসে মানুষ এখন রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি পরিপক্ব। সহজে তাদের ভোলানো কঠিন, ভুল বোঝানো আরও বেশি কঠিন।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতার চেয়ে ব্যর্থতাই বেশি। অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে খুব বেশি উত্তরণ আমাদের ঘটেনি। প্রবাসী আয় বেড়েছে। দেশে বৈধ পথে অর্থের সরবরাহ অনেক বেড়েছে। দ্রব্যমূল্য ধরে রাখার ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগও প্রশংসনীয়। কিন্তু কাঠামোগত সংস্কারের জায়গায় সরকার ব্যর্থতা আছে। এই সরকার এখনো আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল।

দুঃখজনক অভিযোগ

জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ছিলেন, এমন অনেকের বিরুদ্ধেই দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। ক্ষমতায় বা ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে নানা ধরনের সুযোগের হাতছানি তৈরি হয়। সবার পক্ষে ওই লোভ সংবরণ করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। তবু যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়েছে, তারা তো জেনেবুঝেই তা করেছে, পরে যাতে কোনো রাজনৈতিক দুর্যোগ এলে টাকা দিয়ে সেটা তারা মোকাবিলা করতে পারে। এই একই যুক্তিতে আওয়ামী লীগও লুটপাট করেছিল।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে এতগুলো মানুষের জীবনদানের পরও যে আমরা খুব বেশি পরিবর্তন দেখিনি, তার কারণ হলো ছাত্রদের অনেকে দূষণের শিকার হয়েছে, সামাজিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

সরকার প্রত্যাশা কতটা পূরণ করল

অন্তর্বর্তী সরকার অসম্ভব জনতুষ্টিবাদী আচরণ করেছে। তারা যে শুধু মব ভায়োলেন্স বা জোটবদ্ধ হিংসাকে সামাল দিতে পারেনি তা–ই নয়, অনেক ক্ষেত্রে একে আশকারাও দিয়েছে। এ কারণে সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য সরকারের যেখানে বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার, সেখানে আমরা দেখছি তার বিপরীত চিত্র। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

তারপরও মনে করি, মানুষ এই সরকারকে সময় দিতে চায়, যদিও এই সরকারের সক্ষমতা কম। বর্তমান আমলাতন্ত্র বা পুলিশ আগের মতোই চলছে। জনগণ তবু এই সরকারকে সুযোগ দিতে চায়। সরকারের প্রতি তারা একটা স্তর পর্যন্ত সমর্থন দিচ্ছে। কারণ, এটা গণ–অভ্যুত্থানের সরকার। মানুষ এই আস্থা রাখতে চায় যে সরকার খুব বড় ধরনের দুর্নীতিতে জড়াবে না বা দেশের অর্থনীতিতে বড় কোনো ক্ষতি হতে দেবে না।

গত প্রায় এক বছরে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের হত্যাযজ্ঞের বিচারের ক্ষেত্রে এই সরকার খুব বেশি অগ্রগতি করতে পারেনি। বিচারের বিষয়টি ঝুলে গেছে। সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু বড় যে সংস্কার, যেগুলো আমাদের দরকার ছিল—যেমন আমলাতন্ত্রে বা পুলিশে—সেগুলোর কিছুই হয়নি। দুর্নীতির কাঠামোও নানাভাবে টিকে আছে।

বৈষম্য তো আগের মতোই বহাল তবিয়তে আছে। পরিবর্তন বলতে একটাই, মানুষ আগের তুলনায় বেশি কথা বলছে, অধিকারের দাবি বেশি করে তুলে ধরছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের নিজের অগ্রাধিকার ঠিক করতে পারেনি। তাদের কোনো লক্ষ্য বা পথরেখা আছে বলে মনে হয় না। যথাযথ পরিকল্পনার অভাবও প্রকট। সামাজিক বৈষম্যগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে না পারায় তা দূর করার ব্যাপারে সরকারের দুর্বলতা মারাত্মকভাবে চোখে পড়ছে। বৈষম্য নিরসনের জন্য একটা দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তৈরি করার ক্ষেত্রে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারগুলোর সহযোগিতা এবং আহত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন এবং চিকিৎসার বিষয়েও সরকার খুবই গোঁজামিল দিয়েছে। এসব তথ্য দিয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ গেজেট প্রকাশিত হয়নি। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ও তাঁর মন্ত্রণালয় কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতার কারণে আহতদের তালিকা তৈরি করতে অনেক দেরি হয়েছে এবং বহু ভুয়া আহত তাতে ঢোকার সুযোগ পেয়েছে। তাদের চিকিৎসাও কষ্টকরভাবে বিলম্বিত হয়েছে। পুনর্বাসনের প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে খুবই ধীরগতিতে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনকেও এর দায় নিতে হবে।

মামলার নামে যে বাণিজ্যচক্র তৈরি হয়েছে, সেটা বন্ধ করা দরকার ছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কথা দিয়েছিলেন, মামলা-বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে গণ-অভ্যুত্থানের মামলাগুলো তাদের ট্রাইব্যুনালে নিয়ে নেবে। সেটা তো হয়ইনি, উল্টো মামলাগুলোকে সেভাবে রেখে দিয়ে এখন তারা শুধু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত করছে। পুরো প্রক্রিয়া সমন্বিতভাবে হচ্ছে না। এভাবে তো চলতে পারে না।

এই পরিস্থিতির কারণে মামলা-বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আর সে সুযোগ তো এক অর্থে তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কারণেই। এটা তাদের বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে। এ ছাড়া ওখানে যে গুটিকয় মামলা হয়েছে, সেগুলোও ধীরগতিতে চলছে।

সংগঠিত হতে হবে

জুলাই অভ্যুত্থান করেছে জনগণ। গত বছর এই মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ গভীর এক সংকটের মধ্যে ছিল। অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক সংকট। রাজনৈতিক শক্তিগুলো সংকট থেকে দেশের উত্তরণ ঘটাতে পারছিল না। সে সময় ছাত্ররা একটা আন্দোলনে মাঠে নামে, একপর্যায়ে দেশের জনগণও মাঠে নেমে আসে। তারাই স্বৈরাচারী সরকারকে দেশছাড়া করে।

আমি মনে করি, জনগণই জুলাইয়ের প্রকৃত ধারক। ভবিষ্যতে আমরা রাষ্ট্রে যে পরিবর্তন ও সংস্কার দেখতে চাই, আমরা যে জাতিগঠনের কথা বলি, সেটা জনগণের পক্ষেই সম্ভব। রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু জনগণ কোনো না কোনোভাবে দেশকে রক্ষা করবে। আমি মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখি।

তাই আশা হারানোর কিছু নেই। বরং সংগঠিত হওয়ার নতুন নতুন প্রক্রিয়াগুলো আমাদের তৈরি করতে হবে।

এমবি/এইচআর