শতবর্ষী পিএস মাহসুদ আবার নদীতে, যাত্রীদের উচ্ছ্বাস

দীর্ঘ বিরতির পর আবারও নদীপথে ফিরেছে বিআইডব্লিউটিসির ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহসুদ। শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) সকালে বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর তীরে ঘন কুয়াশা আর নরম আলো ভেদ করে স্টিমারটির শুভযাত্রা যেন ফিরিয়ে এনেছে শতবর্ষী ইতিহাসের এক জীবন্ত অংশ।

Nov 28, 2025 - 11:23
 0  2
শতবর্ষী পিএস মাহসুদ আবার নদীতে, যাত্রীদের উচ্ছ্বাস
ছবি সংগৃহীত

মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ

দীর্ঘ বিরতির পর আবারও নদীপথে ফিরেছে বিআইডব্লিউটিসির ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহসুদ। শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) সকালে বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর তীরে ঘন কুয়াশা আর নরম আলো ভেদ করে স্টিমারটির শুভযাত্রা যেন ফিরিয়ে এনেছে শতবর্ষী ইতিহাসের এক জীবন্ত অংশ।

নদীতীরের ভোরলাগা দৃশ্য, কুয়াশার ফাঁক গলে ওঠা সূর্যালোক আর দূর থেকে ভেসে আসা স্টিমারের বাঁশি—সব মিলিয়ে মনে হয়েছে সময় যেন পেছনে ফিরে গেছে। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যে নদীর আবহ, যে নিঃশব্দ যাত্রাপথের গল্প—মাহসুদ তারই বহমান স্মৃতি।

১৯১৭ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত কবি জীবনানন্দ দাশ নিয়মিত বরিশাল–খুলনা–কলকাতা রুটে স্টিমারে ভ্রমণ করতেন। গবেষক হেনরী স্বপনের তথ্য অনুযায়ী, পিএস মাহসুদ, পিএস অস্ট্রিচ, পিএস লেপচা ও পিএস টার্নে তাঁর যাতায়াত ছিল নিয়মিত। সে সময় নদীই ছিল বরিশালের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। অর্থনৈতিক টানাপড়েনে কবির যাত্রা হতো থার্ড ক্লাসে—কাঠের বেঞ্চ, ভিড় আর স্যাঁতসেঁতে ডেক—যার ছাপ তাঁর সাহিত্যজুড়ে স্থায়ীভাবে রয়ে গেছে।

১৮শ শতকের শেষ দিকে ব্রিটিশদের হাত ধরে এ অঞ্চলে প্যাডেল স্টিমারের যাত্রা শুরু। দুই পাশে চাকা থাকায় একে ‘রকেট’ বলা হতো। পরে নকশা বদলে চাকা নেওয়া হয় পেছনে। সর্বশেষ তিনটি প্যাডেল স্টিমারের চলাচল ২০২২ সালে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বহুদিন অনিশ্চয়তায় থাকলেও সংস্কারের পর নতুন রূপে মহসুদ আবার নদীতে ভেসে উঠেছে। ইঞ্জিন পরিবর্তন, কাঠের ডেক সংস্কার, চাকা রঙ—সবকিছু নতুন হলেও স্টিমারের পুরোনো গন্ধ, বাঁশির সুর ও কাঠের সিঁড়ির শব্দ আগের মতোই রাখা হয়েছে। প্রকৌশলীরা বলছেন, স্টিমারে উঠলেই মনে হবে যেন অন্য এক যুগে ফিরে যাওয়া।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ভাড়া নির্ধারণ করেছে—

  • সুলভ শ্রেণি: ৬০০ টাকা

  • দ্বিতীয় শ্রেণি: ১,৬৫০ টাকা

  • প্রথম শ্রেণি: ২,৬০০ টাকা (ভ্যাটসহ)

ঢাকা থেকে চাঁদপুর হয়ে বরিশালের পথে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টায় যাত্রা শুরু করবে মাহসুদ। বরিশালে স্থায়ী ঘাট না থাকায় আপাতত ত্রিশ গোডাউন পন্টুনে ভেড়ানো হবে। পরদিন শনিবার (২৯ নভেম্বর) সকালে আবার ঢাকার পথে রওনা দেবে। গত সপ্তাহে ভাড়া চূড়ান্ত না হওয়ায় প্রথম যাত্রা বাতিল হয়েছিল। এখনো আনুষ্ঠানিক অনুমতি ও ফিটনেস সনদ না মিললেও এদিন থেকেই স্টিমারটি চলাচল শুরু করেছে।

১৯২২ সালে নির্মিত পিএস মাহসুদ নদীপথের শত বছরের স্মৃতি বহন করে। এর আকর্ষণ বিলাসিতায় নয়—বরং ইতিহাস, মানুষের যাত্রাস্মৃতি আর জীবনানন্দ দাশের কবিতায় আঁকা নদীর স্নিগ্ধতায়। কাঠের ডেকে দাঁড়ালে মনে হয়, এই পথ দিয়েই হয়তো হেঁটেছিলেন কবি; নদী তখনো নীরবে গল্প বলেছিল তাকে। মাহসুদ তাই শুধু একটি স্টিমার নয়—এ অঞ্চলের সময়, ইতিহাস ও স্মৃতির ভাসমান সাক্ষী।

এমবি এইচআর