নদীঘেরা আসনে ব্যয়বহুল প্রচারণা, ‘জনতার কাছে সাহায্য চাইলেন ফুয়াদ
বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ–মুলাদী) সংসদীয় আসনটি পাঁচটি বড় নদী পরিবেষ্টিত একটি এলাকা। চরাঞ্চল, খেয়া ও নৌপথনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এখানে নির্বাচনী প্রচারণা বরাবরই সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ
বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ–মুলাদী) সংসদীয় আসনটি পাঁচটি বড় নদী পরিবেষ্টিত একটি এলাকা। চরাঞ্চল, খেয়া ও নৌপথনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এখানে নির্বাচনী প্রচারণা বরাবরই সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। নৌকা ভাড়া, চরাঞ্চলে অবস্থান, কর্মী পরিবহন, পথসভা ও বড় জমায়েত—সব মিলিয়ে প্রচারণার ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়। এই বাস্তবতায় এবারের নির্বাচনে প্রচারণার অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন এবি পার্টির প্রার্থী মো. আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া, যিনি ব্যারিস্টার ফুয়াদ নামে পরিচিত। রবিবার (৪ জানুয়ারি) রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি নির্বাচনী প্রচারণার জন্য ভোটারদের আর্থিক সহযোগিতা চান। নদীঘেরা প্রত্যন্ত এই জনপদে মানুষের কাছে পৌঁছাতে বড় অঙ্কের ব্যয় প্রয়োজন—এ কথা তুলে ধরে তিনি প্রচারণাকে জনতার অংশগ্রহণে পরিচালনার কথা জানান।
এই আসনে ব্যারিস্টার ফুয়াদকে সমর্থন দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ফলে দলটি আলাদা কোনো প্রার্থী দেয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সমর্থনের ফলে তার প্রচারণার বিস্তার ঘটলেও বরিশাল-৩ আসনের ভৌগোলিক বাস্তবতা অপরিবর্তিত রয়েছে। বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোয় নৌপথে যাতায়াত নির্বাচনী প্রচারণাকে আরও জটিল করে তোলে।
এ বাস্তবতায় প্রচারের বড় ভরকেন্দ্র হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে বেছে নিয়েছেন ফুয়াদ। ফেসবুক, ইউটিউব ও টিভি টক শোতে নিয়মিত উপস্থিত থেকে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি সেখান থেকেই আর্থিক সহযোগিতার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী, ফুয়াদের বার্ষিক আয় ৭ লাখ ৪১ হাজার ৬০২ টাকা। এর মধ্যে আইন পেশা থেকে আয় ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং টিভি টক শো, ইউটিউব ও ফেসবুক থেকে আয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার টাকা। তার নিজের হাতে নগদ রয়েছে ২ লাখ টাকা। ব্যাংকে তার নামে জমা আছে সাড়ে ৩ লাখ টাকা এবং স্ত্রীর নামে রয়েছে ১৮ হাজার টাকা। স্ত্রীর হাতে নগদ রয়েছে আরও ৫০ হাজার টাকা।
ভোটের অঙ্ক ৩১ লাখ
বরিশাল-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১০ হাজার ৯২ জন। নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী, জনপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা হিসেবে একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ৩১ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্বাচনী ব্যয় করতে পারবেন। কিন্তু ফুয়াদের ঘোষিত নগদ অর্থ ও ব্যাংক জমা মিলিয়ে মোট অর্থ প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা। স্ত্রীর নামে ঘোষিত অর্থসহ মোট ঘোষিত সামর্থ্য অনুমোদিত ব্যয়ের সীমার তুলনায় অনেক কম।
এদিকে এবি পার্টির প্রার্থী ফুয়াদ, গণঅধিকার পরিষদের ইয়ামিন এইচ এম ফারদিন, জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপু এবং এলডিপি জোটের ফকরুল আহসান—এ চার প্রার্থী নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে নির্বাচনী ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য এখনো যুক্ত করেননি।
অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী জয়নুল আবেদীন জানিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। জাতীয় পার্টির ইকবাল হোসেনের সম্ভাব্য ব্যয় ২০ লাখ টাকা। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিজ আয়ের অর্থ থেকে দুই লাখ টাকা এবং দলীয় কর্মী-সমর্থকদের স্বেচ্ছা অনুদান থেকে আরও চার লাখ টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। বাসদের প্রার্থী আজমুল হাসান জিহাদ জানিয়েছেন, তিনি নিজ আয়ের অর্থ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা এবং প্রবাসী আত্মীয়দের অনুদান হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় করবেন।
প্রশ্নের মুখে ‘জনতার টাকা’
ফুয়াদের হলফনামা অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ করবর্ষে তার মোট সম্পদের পরিমাণ ৫ লাখ ৯১ হাজার ২৮৪ টাকা। তিনি আয়কর দিয়েছেন ২০ হাজার ৭৭৩ টাকা। পেশায় আইনজীবী এবং স্ত্রী গৃহিণী। ইলেকট্রনিক পণ্য ও আসবাবপত্র মিলিয়ে পারিবারিক সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে প্রায় সাত লাখ টাকা।
এই আয় ও সম্পদের হিসাবের সঙ্গে নদীঘেরা বরিশাল-৩ আসনের নির্বাচনী বাস্তবতা তুলনা করলে প্রশ্ন উঠছে—প্রচারণার বড় অঙ্কের অর্থের উৎস কী। স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, নৌপথে যাতায়াত, চরাঞ্চলে প্রচার ও কর্মী ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য ব্যয় ছাড়া কার্যকর প্রচারণা চালানো কঠিন।
প্রার্থী ফুয়াদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রচারণার জন্য সংগৃহীত অর্থ মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে নেওয়া হচ্ছে এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হবে, যাতে যে কেউ তা দেখতে পারেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর বরিশাল সম্পাদক রফিকুল আলমের মতে, নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও মাঠের বাস্তবতা ও হলফনামায় ঘোষিত অঙ্কের মধ্যে পার্থক্য নতুন কোনো বিষয় নয়।
এমবি এইচআর

