নতুন নেতৃত্ব, নতুন প্রত্যাশা: বদলাবে কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা?

মাত্র দুই বছরেরও কিছু বেশি সময় আগে শেখ হাসিনা এমন এক নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন, যা দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।

Feb 14, 2026 - 13:43
 0  1
নতুন নেতৃত্ব, নতুন প্রত্যাশা: বদলাবে কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা?
ছবি, সংগৃহিত

মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ

মাত্র দুই বছরেরও কিছু বেশি সময় আগে শেখ হাসিনা এমন এক নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন, যা দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। তখন ধারণা করা কঠিন ছিল যে, তার টানা ১৫ বছরের ক্ষমতার অধ্যায় হঠাৎ ভেঙে পড়বে কিংবা দীর্ঘদিন কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এত শক্তভাবে ঘুরে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পালাবদল নতুন নয়। কয়েক দশক ধরেই এই দুই দল পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় এসেছে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান এবং এই প্রথম তিনি সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।

গত বছরের শেষের দিকে অসুস্থতার কারণে মারা যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। চার দশক ধরে তিনি দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম নেতা জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পর তার মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে ১৭ বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। মায়ের কারাবাস ও অসুস্থতার সময় তিনি ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্ব দিয়েছেন, তবে অনেকের চোখে এখনো তিনি অপরীক্ষিত নেতা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নবীন মুরশিদের মতে, পূর্ব অভিজ্ঞতার অভাবই হয়তো তার পক্ষে কাজ করছে। মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রবল, তারা নতুন ও ভালো কিছু দেখতে চায়। ফলে প্রত্যাশাও অনেক বেশি।

বিএনপি জানিয়েছে, তাদের প্রথম অগ্রাধিকার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার। দলটির জ্যেষ্ঠ নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গত এক দশকে দুর্বল হয়ে পড়া গণতান্ত্রিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করা জরুরি। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন প্রতিশ্রুতি অতীতেও দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ক্ষমতায় এসে অনেক দলই ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণ শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ত্বরান্বিত করে। তরুণ প্রজন্মের একাংশ মনে করছে, তারা আর পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি মেনে নেবে না। বিদ্রোহে অংশ নেওয়া তরুণ-তরুণীদের ভাষ্য, তাদের মূল প্রত্যাশা দুর্নীতিমুক্ত শাসন, স্থিতিশীল অর্থনীতি ও জাতীয় ঐক্য। তারা মনে করেন, প্রয়োজনে আবারও আন্দোলনে নামার মানসিকতা তাদের রয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সহিংসতা এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নতুন সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যের দাম কমানো এবং বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।

সমাজবিজ্ঞানী সামিনা লুৎফা মনে করেন, সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতার অভাব প্রায় সব দলকেই প্রভাবিত করে। এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী উল্লেখযোগ্য আসন পেয়েছে এবং শিক্ষার্থী নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টিও প্রথমবারের মতো সংসদে প্রবেশ করেছে। ফলে বহুমাত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় সমন্বয় রক্ষা করাও নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে।

নারী প্রতিনিধিত্বের বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মোট প্রার্থীর অল্প অংশ নারী ছিলেন। সংসদের ৩৫০টি আসনের মধ্যে ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত এবং ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন। সংরক্ষিত আসনে দলগুলো তাদের নির্বাচনী ফলাফলের অনুপাতে নারী সদস্য মনোনয়ন দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দলগুলোকে আরও সক্রিয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগকে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে বিএনপি নেতারা সরাসরি অবস্থান নিতে চাননি। তাদের বক্তব্য, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটের বিষয়ে শেষ পর্যন্ত জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে।

ভূমিধস জয়ের পর নতুন নেতৃত্বের সামনে তাই প্রত্যাশা যেমন বিশাল, তেমনি চ্যালেঞ্জও বহুমাত্রিক। গণতন্ত্রের পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার—এসব ক্ষেত্রেই বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারলেই কেবল নতুন সরকার নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণে সফল হবে।

এমবি এইচআর