ভোটের তফসিলের পর দেশে রাজনৈতিক খুন ১৫, বাড়ছে উদ্বেগ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিনই দুর্বৃত্তের গুলির নিশানা হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। এ ঘটনার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়তে থাকে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা।

Jan 17, 2026 - 14:41
Jan 17, 2026 - 14:44
 0  2
ভোটের তফসিলের পর দেশে রাজনৈতিক খুন ১৫, বাড়ছে উদ্বেগ
ছবি, সংগৃহীত

মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিনই দুর্বৃত্তের গুলির নিশানা হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। এ ঘটনার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়তে থাকে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও সহিংসতার ঘটনা থামছে না। হিসাব অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর গত ৩৬ দিনে সারা দেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিহতদের মধ্যে বিএনপির নেতা-কর্মীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এসব হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশই সংঘটিত হয়েছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ‘প্রস্তুত’ থাকার কথা জানালেও ভোটের আগে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ কাটেনি।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ অবস্থায় একের পর এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এখনই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে নির্বাচনের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে অবৈধ অস্ত্র থাকার বিষয়টি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে অনেক প্রার্থী পুলিশি নিরাপত্তা চাইছেন, কেউ কেউ তা পেয়েছেনও।

শহীদ শরিফ ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ৭ জানুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় বিএনপির সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজের রহমান ওরফে মোছাব্বিরকে। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় ছুরিকাঘাতে নিহত হন বিএনপির এক ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর কর্মী।

গত ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর এক মাসে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিহত ১৫ জনের মধ্যে বিএনপির ১২ জন। অন্য তিনজনের মধ্যে রয়েছেন শহীদ ওসমান হাদি, জামায়াতে ইসলামীর একজন কর্মী এবং নিষিদ্ধ সংগঠন যুবলীগের এক নেতা। হত্যার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়—ছয়জন গুলিতে, চারজন ধারালো অস্ত্রের আঘাতে এবং বাকি পাঁচজন ছুরিকাঘাত ও শ্বাসরোধে নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডেই ব্যবহার হয়েছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র।

স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজের রহমান মোছাব্বির হত্যাকাণ্ডে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা সবাই ভাড়াটে খুনি বলে জানিয়েছে পুলিশ, যাদের একজন ‘শুটার’। তবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এবং নেপথ্যের মূল পরিকল্পনাকারীও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তফসিল ঘোষণার পর সংঘটিত ১৫টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ১৪টিতেই মূল পরিকল্পনাকারীকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। শুধু গত ২৪ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে জাসাস নেতা ফরিদ সরকার হত্যার ঘটনায় পরিকল্পনাকারী গ্রেপ্তারের দাবি করেছে পুলিশ। ১৫ জনের মধ্যে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা করা হলেও কেবল ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডেই আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে আধিপত্য বিস্তার, এলাকা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব। যেমন, ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানে উপজেলা যুবদলের সদস্য মুহাম্মদ জানে আলমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান (পদ স্থগিত) গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আবার ধোবাউড়ায় নিহত মো. নজরুল ইসলাম ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমরের কর্মী; অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় তিনি নিহত হন।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত। অনেক ক্ষেত্রে এসব অপরাধ পূর্ববিরোধ, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও হঠাৎ সহিংসতার ফল। প্রতিটি ঘটনার আলাদা তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, নির্বাচনের আর ২৬ দিন বাকি থাকতে বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। তিনি বলেন, সহিংস ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নীরব না থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

এমবি এইচআর