জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি: আইন, ইতিহাস ও বিতর্ক

‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দিতে অধ্যাদেশ জারির উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ লক্ষ্যে অধ্যাদেশের খসড়া প্রস্তুতের জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা–সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে গত ৫ জানুয়ারি এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

Jan 13, 2026 - 12:36
 0  2
জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি: আইন, ইতিহাস ও বিতর্ক
ছবি সংগৃহীত

মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ

‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দিতে অধ্যাদেশ জারির উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ লক্ষ্যে অধ্যাদেশের খসড়া প্রস্তুতের জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা–সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে গত ৫ জানুয়ারি এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই প্রেক্ষাপটে দায়মুক্তি কী, কেন দেওয়া হয় এবং অতীতে দেশে ও বিদেশে এর কী কী নজির রয়েছে—তা প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: দায়মুক্তি কী?
উত্তর: সাধারণ অবস্থায় আইনের দৃষ্টিতে যেসব কাজ অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, যুদ্ধ, গণ-অভ্যুত্থান বা বিশেষ রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতিতে সেগুলোর কিছু অপরাধ হিসেবে বিবেচিত নাও হতে পারে। রাষ্ট্র যখন বিশেষ আইন প্রণয়ন করে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য বিচার বা আইনি প্রক্রিয়া থেকে সুরক্ষা দেয়, তখন তাকে দায়মুক্তি বলা হয়। দায়মুক্তি কার্যকর হলে ওই কর্মকাণ্ডের জন্য মামলা বা শাস্তি দেওয়ার সুযোগ থাকে না।
সাধারণত জাতীয় স্বার্থ, জনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা কিংবা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে দায়মুক্তি আইন করা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে এর অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

প্রশ্ন: দায়মুক্তির প্রসঙ্গটি কীভাবে এল?
উত্তর: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ঘটনাবলির জন্য দায়মুক্তির দাবি দীর্ঘদিন ধরে উঠছিল। গত বছরের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্দেশনা দেয়—১৫ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থান–সংশ্লিষ্ট ঘটনায় কোনো মামলা, গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা হবে না।
এ ছাড়া ৫ আগস্ট ঘোষিত জুলাই ঘোষণাপত্রে শহীদদের জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃতি এবং আহত যোদ্ধা ও আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়।
সম্প্রতি জুলাই যোদ্ধা পরিচয়ে তাহরিমা জান্নাত সুরভী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসান গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এর পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে অধ্যাদেশ জারির দাবি তোলে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের সংবিধানে কি দায়মুক্তির সুযোগ আছে?
উত্তর: সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বা দেশের কোনো অঞ্চলে শৃঙ্খলা রক্ষা ও পুনর্বহালের উদ্দেশ্যে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের জন্য সংসদ আইন প্রণয়ন করে দায়মুক্তি দিতে পারবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই বিধানের অন্তর্নিহিত ভাবনা থেকেই জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের জন্য কীভাবে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল?
উত্তর: স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডার জারি করেন। এতে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ড এবং ১৯৭২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে গৃহীত কার্যক্রমের জন্য কোনো মামলা বা আইনি প্রক্রিয়া না চালানোর বিধান রাখা হয়।

প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া আর কোনো দায়মুক্তির উদাহরণ আছে কি?
উত্তর: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবার নিহত হওয়ার পর ২৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করেন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের আমলে এটি সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বৈধতা পায়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার এই আইন বাতিল করে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করে।
এ ছাড়া ২০০২–২০০৩ সালে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর সময় যৌথ বাহিনীর অভিযানে সংঘটিত ঘটনাগুলোর বিচার এড়াতে যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন করা হয়, যা ২০১৫ সালে উচ্চ আদালত অসাংবিধানিক ঘোষণা করে।

প্রশ্ন: বিদ্যুৎ খাতে দায়মুক্তির বিষয়টি কী?
উত্তর: ২০১০ সালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধির বিশেষ বিধান আইন করা হয়, যাতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই কাজ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়। এ আইনের অধীনে নেওয়া সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যেত না বলে এটি দায়মুক্তি আইন হিসেবে পরিচিতি পায়। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালে আইনটি স্থগিত এবং পরে বাতিল করে।

প্রশ্ন: বিশ্বের অন্য দেশে কি দায়মুক্তির উদাহরণ আছে?
উত্তর: যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধের পর ১৮৭২ সালে অ্যামনেস্টি অ্যাক্টের মাধ্যমে সাবেক বিদ্রোহী সেনাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়। লেবাননে ১৯৯১ সালে গৃহযুদ্ধ–পরবর্তী সাধারণ ক্ষমা আইন পাস হয়।
তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো দায়মুক্তি আইন হয়নি; বরং নুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে পরাজিত পক্ষের নেতাদের বিচার করা হয়, যা অনেক গবেষকের মতে ‘বিজয়ীদের বিচারব্যবস্থা’ হিসেবে পরিচিত।

এমবি এইচআর