চোখ রাঙ্গাচ্ছে শীলকালীন রোগ, সতর্কবার্তা চিকিৎসকদের

দেশজুড়ে নামতে শুরু করেছে শীতের আমেজ। পঞ্চগড়ে তাপমাত্রা নেমেছে ১২ ডিগ্রিতে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেড়েছে শীতের উপস্থিতি।

Nov 12, 2025 - 15:58
 0  4
চোখ রাঙ্গাচ্ছে শীলকালীন রোগ, সতর্কবার্তা চিকিৎসকদের
ছবি-সংগৃহিত

মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ

দেশজুড়ে নামতে শুরু করেছে শীতের আমেজ। পঞ্চগড়ে তাপমাত্রা নেমেছে ১২ ডিগ্রিতে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেড়েছে শীতের উপস্থিতি। তবে এই ঋতুর আগমন যতটা আনন্দের, ততটাই শঙ্কার— কারণ বাড়ছে শীতজনিত রোগের প্রকোপ। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশি, অ্যাজমা, স্ক্যাবিস ও ডায়রিয়ার মতো রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ৬ নভেম্বর ২৪ ঘণ্টায় বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা ১,২৮০ জন শিশুর প্রায় অর্ধেকই শীতজনিত রোগে আক্রান্ত। নিউমোনিয়া, সাধারণ সর্দি-কাশি, অ্যাজমা, স্ক্যাবিস ও ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। একই অবস্থা দেখা গেছে ৫ নভেম্বর তারিখের তথ্যেও।

চিকিৎসকরা বলছেন, গরম থেকে হঠাৎ ঠাণ্ডায় যাওয়ার সময়টিকে বলা হয় ‘ক্রিটিক্যাল পিরিয়ড’। এ সময়ে সামান্য অসতর্কতা বড় ধরনের শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ বা নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাই এখন থেকেই সতর্ক থাকা এবং শীতের প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের এপিডেমিওলজি ও রিসার্চ বিভাগের তথ্যে দেখা যায়, এই সময় নিউমোনিয়া, অ্যাজমা এবং সাধারণ সর্দি-কাশির রোগীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান।

ডা. আয়েশা আক্তার, উপপরিচালক, ২৫০ শয্যা টিবি হাসপাতাল, শ্যামলী বলেন, “শীতের শুরুতে হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তনে ঠাণ্ডা, সর্দি, কাশি বেড়ে যায়। সকালে ঠাণ্ডা, দুপুরে গরম, রাতে আবার ঠাণ্ডা—এই ওঠানামা নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট বাড়ায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের সিভিয়ার নিউমোনিয়ায় মৃত্যুঝুঁকি বেশি।”

তিনি আরও বলেন, “শীতে পর্যাপ্ত পানি পান, যথেষ্ট ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম এবং খোলা বাতাসে থাকা উচিত। শিশুদের সকালে গরম পোশাক, দুপুরে খেলাধুলার সময় হালকা পোশাক পরানো দরকার। ঠাণ্ডা লাগলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়া বিপজ্জনক।”

ডা. শেখ মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম, হিউম্যান এইড বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন হাসপাতালের চিকিৎসক, বলেন, “শীতের রোগ বয়সভেদে ভিন্ন হয়। শিশুদের নিউমোনিয়া ও রোটা ভাইরাসের সংক্রমণ বেশি দেখা যায়; তরুণদের টনসিলাইটিস ও ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়; বয়স্কদের জয়েন্ট পেইন বা আর্থ্রাইটিস বাড়ে। তাছাড়া শীতে জামাকাপড় ও বিছানা কম ধোয়ার কারণে স্ক্যাবিসের সংক্রমণও বৃদ্ধি পায়।”

তিনি করণীয় বিষয়ে বলেন, “এই সময়ে প্রোটিন, ফ্যাট ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া জরুরি। জামাকাপড় পরিষ্কার রাখা, কুসুম গরম পানি পান করা এবং গরম পোশাক পরা আবশ্যক। জটিল রোগে ভোগা ব্যক্তিদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে।”

চিকিৎসকরা বলছেন, ঋতু পরিবর্তনের এ সময়ে সামান্য সতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে অনেক শীতজনিত রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাদ্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং চিকিৎসকের পরামর্শই এখন সবচেয়ে বড় প্রতিরোধব্যবস্থা।

এদিকে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নবজাতক পর্যায়ে নিউমোনিয়াজনিত শিশু মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি—৫২ শতাংশ। এক মাস থেকে এক বছরের মধ্যে ৩২ শতাংশ, এবং এক থেকে পাঁচ বছর বয়সে ১৬ শতাংশ। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আক্রান্ত শিশুদের ৫২ শতাংশই মারা যাচ্ছে চিকিৎসা না পেয়ে ঘরে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সময়মতো চিকিৎসা, টিকাদান এবং ঘরের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত জরুরি। গবেষণা বলছে, দেশে নিউমোনিয়ার জীবাণুজনিত কারণের অর্ধেক এখনো অজানা, যা প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।

২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যুহার ৭.৪ শতাংশ—যা এখনো উদ্বেগজনক। এই বাস্তবতায় আজ ১২ নভেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য— “সুস্থ সূচনা, আশার ভবিষ্যৎ।”

বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শিশুদের নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—শিশুকে উষ্ণ রাখা, বুকের দুধ খাওয়ানো, নিয়মিত হাত ধোয়া, ধোঁয়ামুক্ত পরিবেশে রাখা এবং টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে নিউমোনিয়া প্রতিরোধ সম্ভব।

এমবি এইচআর