অলস পড়ে আছে বহু বাণিজ্যিক স্পেস, খেলাপি ঋণ বাড়ার শঙ্কা

রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ের ফলে দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশে বিরূপ প্রভাব দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় নতুন বিনিয়োগ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাণিজ্যিক স্পেস বা কমার্শিয়াল ফ্লোর ভাড়ার বাজারে। কাঙ্ক্ষিত ভাড়াটিয়া না মেলায় ফাঁকা পড়ে আছে অনেক বাণিজ্যিক স্থাপনা।

Sep 18, 2025 - 15:32
Oct 13, 2025 - 14:05
 0  3
অলস পড়ে আছে বহু বাণিজ্যিক স্পেস, খেলাপি ঋণ বাড়ার শঙ্কা
ছবি-সংগৃহিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ের কারণে দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশে গভীর স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় নতুন বিনিয়োগ কার্যত থমকে গেছে। এতে সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাণিজ্যিক স্পেস বা কমার্শিয়াল ফ্লোর ভাড়ার বাজারে। কাঙ্ক্ষিত ভাড়াটিয়া না পাওয়ায় অনেক বাণিজ্যিক স্থাপনা ফাঁকা পড়ে আছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে নির্মিত এসব ভবন ভাড়া বা বিক্রি না হওয়ায় তা ক্রমেই খেলাপি ঋণে পরিণত হচ্ছে।

রিয়েল এস্টেট খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বর্তমানে রাজধানীর ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাণিজ্যিক স্পেস খালি পড়ে আছে। এতে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছেন ভবনমালিকরা। সময়মতো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় খেলাপি ঋণও বেড়ে চলেছে।

ঋণ বিতরণ ও খেলাপি ঋণের চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে নির্মাণ খাতে এক লাখ সাত হাজার ৭৫২ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আগের বছর ২০২৩ সালে এ খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৭ হাজার ৬৮ কোটি টাকা—অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে প্রায় ১৯ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।

একই সময়ে গৃহঋণ খাতে ২০২৪ সালে বিতরণকৃত ৩৪ হাজার ৩৬১ কোটি টাকার মধ্যে খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৪ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। আগের বছর এ হার ছিল মাত্র ৫ দশমিক ০৯ শতাংশ।

নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ নেই, ভাড়াটিয়া মেলে না
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পুরোনো কমার্শিয়াল ভবনগুলোতে একের পর এক ফ্লোর খালি হচ্ছে। পুরোনো ভাড়াটিয়ারা ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন, কিন্তু নতুন ভাড়াটিয়া পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে নতুন নির্মিত ভবনের অনেকগুলোতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—যেমন বিদ্যুৎ সংযোগ, লিফট বা পার্কিং সুবিধার অভাব—থাকায় সেগুলোও অলস পড়ে আছে।

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) তথ্য অনুযায়ী, অনেক ভবন মালিক আর্থিক সংকটে ইন্টেরিয়র বা ফিনিশিং কাজ শেষ করতে পারছেন না। ফলে নতুন ভবনগুলোও ভাড়ার বাজারে আসছে না।

উদ্যোক্তাদের ক্ষতির মুখে রিয়েল এস্টেট খাত
এমবিট হোমস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. হারুন অর রশিদ জানান, দেশে ব্যবসা এখন কার্যত স্থবির। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে কেউ নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে কমার্শিয়াল স্পেস বিক্রি বা ভাড়া দেওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংকঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা বহুমুখী ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী সাব্বির আহমেদ বলেন, কমার্শিয়াল স্পেস নিতে গেলে ছয় মাস থেকে এক বছরের অগ্রিম ভাড়া দিতে হয়। কিন্তু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেকে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না, ফলে নতুন বিনিয়োগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন পুরোনো উদ্যোক্তারা
গত এক বছরে বহু পুরোনো ব্যবসায়ী কমার্শিয়াল ফ্লোর ছেড়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের অনেকে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, ফলে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক স্পেস খালি হয়ে আছে। কিন্তু নতুন উদ্যোক্তা না আসায় বাজারে কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।

আলভি এন্টারপ্রাইজের মালিক জাহিদ বলেন, তিনি একাধিক অফিস বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। নতুন করে ভাড়া বা বিক্রি করতে না পারায় তিনি লোকসানে পড়েছেন।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক সংঘাত ও ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ না পাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। জমি বা স্পেস থাকলেও মূলধনের অভাবে তা ফাঁকা পড়ে আছে।

আবাসন খাতেও স্থবিরতা
রিহ্যাবের তথ্যমতে, বর্তমানে তাদের সদস্যদের প্রায় এক হাজার ৮০০টি প্রকল্প চলমান, যেখানে ১৮ হাজার ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। কিন্তু বিক্রি বা ভাড়া হচ্ছে না প্রত্যাশিত হারে। রিহ্যাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া জানান, অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিশেষ সহায়তা এবং পৃথক তহবিল গঠনের প্রয়োজন রয়েছে।

সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ঋণ সংকট ও বিনিয়োগে অনীহা একত্রে দেশের রিয়েল এস্টেট ও বাণিজ্য খাতকে এক ভয়াবহ মন্দার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এমবি এইচআর