বিনিয়োগ স্থবিরতা–ব্যাংকিং দুর্বলতা: জিইডির আপডেটে অনিশ্চয়তায় অর্থনীতি
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক ঝুঁকির ঘেরাটোপে আটকে রয়েছে। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও ব্যবসায়িক আস্থা দুর্বল, বিনিয়োগ স্থবির, ব্যাংকিং খাত ভঙ্গুর অবস্থায়—সব মিলিয়ে অর্থনীতির পূর্ণ পুনরুদ্ধারে অনিশ্চয়তা প্রকট হয়ে উঠেছে।
মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক ঝুঁকির ঘেরাটোপে আটকে রয়েছে। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও ব্যবসায়িক আস্থা দুর্বল, বিনিয়োগ স্থবির, ব্যাংকিং খাত ভঙ্গুর অবস্থায়—সব মিলিয়ে অর্থনীতির পূর্ণ পুনরুদ্ধারে অনিশ্চয়তা প্রকট হয়ে উঠেছে। এর ওপর সামনে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সম্ভাব্য নির্বাচনী ব্যয় বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে অর্থনীতি নির্ভর করছে অনেকগুলো ‘যদি-তবে-কিন্তু’র ওপর।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত নভেম্বর মাসের ইকোনমিক আপডেট বিশ্লেষণ করলে এমন চিত্রই দেখা যায়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থনীতির গতি ফিরে আসা অনেকাংশেই নির্ভর করছে আগামি নির্বাচনের ওপর। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যদি স্পষ্ট রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় এবং নতুন সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারে—বিশেষ করে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও রাজস্ব কাঠামোর শক্তিশালীকরণ—তাহলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার দ্রুততর হবে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ হতে পারে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে নিরবচ্ছিন্ন মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যবসায়িক আস্থা এবং ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বেসরকারি বিনিয়োগকে সীমিত করছে। অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগের আগে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি নামলেও (৮.১৭%), বিনিয়োগের সূচকগুলো খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। ব্যাংকিং খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি টিকে থাকলেও ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ স্থবির। উচ্চ সুদহার, ব্যাংকগুলোর সতর্ক ঋণনীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এ ধীরগতির কারণ। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪.৪৫ শতাংশে—যা বেসরকারি খাতকে ‘ক্রাউড-আউট’ করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজস্ব সংগ্রহেও ধীরগতি রয়েছে। অক্টোবর ২০২৫-এ এনবিআর তিন উৎস থেকে সংগ্রহ করেছে লক্ষ্য থেকে ৮ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা কম। অন্যদিকে এডিপি বাস্তবায়ন কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু তা মূলত বরাদ্দ কমে যাওয়ার প্রভাবে—বাস্তব অগ্রগতির কারণে নয়। প্রকল্প শুরুর বিলম্ব, তহবিল ছাড়ের জটিলতা ও সক্ষমতার ঘাটতি আগের মতোই রয়ে গেছে।
বৈদেশিক খাত অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী থাকলেও রপ্তানিতে ওঠানামা ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে পতন বিনিয়োগ মন্থরতার চিত্র আরও স্পষ্ট করেছে। রিজার্ভ অক্টোবর পর্যন্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২.৩৪ বিলিয়ন ডলারে। তবে ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি জুলাইয়ে নেমে এসেছে মাত্র ২৬৭ মিলিয়ন ডলারে, যা নতুন বিনিয়োগ বন্ধ থাকার ইঙ্গিত।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট, উচ্চ সুদহার ও মুদ্রাস্ফীতি শিল্প খাতকে চরম চাপে ফেলেছে, বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, নির্বাচন স্পষ্ট ম্যান্ডেট দিলে এবং নতুন সরকার দ্রুত সংস্কার শুরু করলে পুনরুদ্ধার সম্ভব। তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘ হলে ঝুঁকি আরও বাড়বে।
এমবি এইচআর

