দুবাইয়ে চাকরির প্রলোভনে পাকিস্তানে জঙ্গি প্রশিক্ষণ: নিহত চার বাংলাদেশি

দুবাইয়ে চাকরি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের পাকিস্তানের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)-তে যুক্ত করার চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

Dec 8, 2025 - 16:52
 0  3
দুবাইয়ে চাকরির প্রলোভনে পাকিস্তানে জঙ্গি প্রশিক্ষণ: নিহত চার বাংলাদেশি
ছবি সংগৃহীত

মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ

দুবাইয়ে চাকরি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের পাকিস্তানের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)-তে যুক্ত করার চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, টিটিপির হয়ে লড়াইরত অবস্থায় অন্তত চারজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন এবং আরও ২৫–৩০ জন বর্তমানে পাকিস্তানে সক্রিয়ভাবে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত।

২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার কারাক জেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত হন মাদারীপুরের তরুণ ফয়সাল হোসেন (২২)। কিছুদিন আগেও পরিবারের কাছে তিনি দুবাইয়ে চাকরির কথা উল্লেখ করেছিলেন। পরে প্রকাশিত এক ছবিতে তাঁর মরদেহ শনাক্ত করেন বড় ভাই আরমান।

একইভাবে নিহত হয়েছেন আরেক তরুণ জুবায়ের আহমেদ (২২)। ইসলামী শিক্ষার ছাত্র এই তরুণের মৃত্যুর খবর ফোনে জানতে পারেন তাঁর মা। তিনি জানান, ছেলেকে প্রতারণার মাধ্যমে নিষিদ্ধ সংগঠনে পাঠানো হয়েছে।

রতন ঢালি: জীবিত না মৃত, দুশ্চিন্তায় পরিবার

তৃতীয় তরুণ রতন ঢালি (২৯)–কে ঘিরে তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সিটিটিসি ইউনিট পরিবারকে জানায়—২৬ সেপ্টেম্বরের অভিযানে তিনিও নিহত হয়েছেন। কিন্তু ১ ডিসেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রতনের নামে একজনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তিনি নিজেকে জীবিত দাবি করেন। সিটিটিসি ভিডিওটিকে ভুয়া বলে জানিয়েছে।

টিটিপির মুখপাত্রও বিষয়টি ঘিরে পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়েছেন। এতে রতনের পরিবার গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছে। তাঁর বাবা বলেন, “একদিন পুলিশ বলে ছেলে মারা গেছে, পরদিন আবার শুনি সে নাকি বেঁচে আছে! আমরা জানি না আসলে কী সত্য।”

বেনাপোল থেকে পাকিস্তান—জঙ্গি তৎপরতায় যাওয়ার রুট

তদন্তে জানা গেছে, ফয়সাল ও রতন ২০২৪ সালের ২৭ মার্চ যশোরের বেনাপোল সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। কয়েকদিন কলকাতা-দিল্লিতে অবস্থানের পর তাঁরা অবৈধভাবে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তানে গিয়ে টিটিপিতে যোগ দেন। দুজনই ঢাকার খিলগাঁওয়ের একটি হিজামা সেন্টারে কাজ করতেন।

জুবায়েরের পথ ছিল ভিন্ন; ওমরাহ করতে সৌদিতে গিয়ে সেখান থেকে বৈধ পথে পাকিস্তানে যান বলে জানিয়েছে সিটিটিসি।

দরিদ্র পরিবারের তরুণরাই বেশি টার্গেট

তিনজনের পরিবারই নিম্ন বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখানো সহজ হওয়ায় এই শ্রেণির তরুণরাই জঙ্গি নিয়োগকারীদের প্রধান লক্ষ্য বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অভাব সহজেই তরুণদের ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে।”

অনলাইনেই বাড়ছে জঙ্গি নিয়োগ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই এখন জঙ্গি নিয়োগের বড় প্ল্যাটফর্ম—এমনটাই জানাচ্ছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। সিটিটিসির তথ্য অনুযায়ী, শুধু টিটিপিই নয়—টিএলপি ও আইএমপি নামের আরও দুটি পাকিস্তানি সংগঠনে বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া, টিটিপির পক্ষে প্রচার ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে সাভার থানায় একটি মামলা হয়েছে এবং অন্তত দুইজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

দেশে হামলা কমলেও বিদেশমুখী জঙ্গি প্রবণতা বাড়ছে

হোলি আর্টিজান হামলার পর দেশে বড় জঙ্গি হামলা কমেছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে নতুন একটি ধারা—বিদেশ গিয়ে জঙ্গি প্রশিক্ষণ নেওয়া।

পরিবারগুলোর অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তা

রতন ঢালির পরিবার জানে না তিনি মৃত না জীবিত। একই অনিশ্চয়তা ঘিরে আছে আরও অনেক পরিবারের জীবনকে। প্রতারণার ফাঁদে পড়ে তরুণরা সীমান্ত পেরিয়ে অজানার পথে হারিয়ে যাচ্ছে, আর পরিবারগুলো বেঁচে আছে অপেক্ষা ও আতঙ্কের ভার নিয়ে।

এমবি এইচআর