অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও হত্যার স্মৃতি নিয়ে আজও লড়ছেন বীরাঙ্গনা খুকু রানী
মুক্তিযুদ্ধের ১৯৭১ সালের সেই ভয়াল দিনের স্মৃতি আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন চট্টগ্রামের হালিশহর নাথপাড়ার বীরাঙ্গনা খুকু রানী। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক কিশোরীর জীবন মুহূর্তেই বদলে দিয়েছিল ৩১ মার্চের বর্বরতা—যার ক্ষত আজও শুকায়নি।
মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ
মুক্তিযুদ্ধের ১৯৭১ সালের সেই ভয়াল দিনের স্মৃতি আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন চট্টগ্রামের হালিশহর নাথপাড়ার বীরাঙ্গনা খুকু রানী। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক কিশোরীর জীবন মুহূর্তেই বদলে দিয়েছিল ৩১ মার্চের বর্বরতা—যার ক্ষত আজও শুকায়নি।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ওইদিন সকালে ইপিআরের (ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট) কয়েকজন বাঙালি যুবক আশ্রয় নেন হালিশহরের নাথপাড়া ও আবদুপাড়ায়। তাদের আশ্রয় দেওয়ার ‘অপরাধে’ বিহারিদের নেতৃত্বে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা নরকে পরিণত করে। হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগে চালানো হয় নির্মম তাণ্ডব।
খুকু রানীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর মা নিরবালা দেবীর কোল থেকে সন্তান ছিনিয়ে নিয়ে দুই টুকরো করে হত্যা করা হয়। এরপর সেই রক্ত মায়ের শরীরে ঢেলে দেওয়া হয় পাশবিক উল্লাসে। অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী খুকু রানীকে ধর্ষণের পর মৃত ভেবে আগুনে ফেলে দেওয়া হয়। চোখের সামনে বাবা, বড় ভাই, দুগ্ধপোষ্য ছোট ভাইসহ ৫১ জন স্বজনকে হত্যা হতে দেখেন তিনি।
সেদিনের ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনায় খুকু রানী বলেন, সকালে দরজায় ধাক্কা দিয়ে নিজেদের ইপিআর সদস্য পরিচয় দিয়ে আশ্রয় চান কয়েকজন যুবক। তাঁদের খাবার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন পরিবারের সদস্যরা। সকাল গড়িয়ে দুপুরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে একদল লোক বাড়িতে ঢোকে। পরে বোঝা যায়, তারা শত্রুপক্ষ। ঢুকেই তারা শুরু করে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ।
তিনি বলেন, “বাবা-ভাইদের লাশ দেখে আমি জ্ঞান হারাই। জ্ঞান ফিরলে দেখি চারপাশে লাশ আর আগুন। শরীরের একাংশ পুড়ে গেছে বুঝতে পারি। আগুন থেকে বাঁচতে পুকুরে ঝাঁপ দিই। পরে আবদুপাড়ায় গিয়ে আশ্রয় পাই।”
শুধু শারীরিক ক্ষত নয়, সেই দিন খুকু রানী হারিয়েছেন সম্ভ্রম, হারিয়েছেন স্বাভাবিক জীবনের অধিকার। আজও সমাজ তাঁকে পূর্ণ স্বীকৃতি দেয়নি। হয়নি সংসার, হয়নি নিরাপদ ভবিষ্যৎ। বহুবার তাঁর কাহিনি গণমাধ্যমে এসেছে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও স্বীকৃতির চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অদৃশ্য এক কারণে আজও তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, নাথপাড়া-আবদুপাড়ার গণহত্যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম হৃদয়বিদারক অধ্যায়। “অনেক চেষ্টা করেও আমরা এই এলাকার মানুষের জন্য যথাযথ কিছু করতে পারিনি। একটি শহীদ বেদী নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটিও এখন অবহেলায় পড়ে আছে,” বলেন তিনি।
ডা. মাহফুজুর রহমান আরও বলেন, “যাদের সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা ও সম্মান পেয়েছি, তাঁদের অবহেলা করলে একদিন এর মূল্য দিতে হবে।”
জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে বীরাঙ্গনা খুকু রানীর এখন একটাই আকাঙ্ক্ষা—রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আর শান্তির মৃত্যু।
এমবি এইচআর

