রাজনৈতিক পরিচয়ই চাঁদাবাজির প্রধান শক্তি
মেঘনাবার্তা প্রতিনিধি:
রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটিয়ে চাঁদাবাজি যেন আরও বেপরোয়া রূপ নিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। ৫ আগস্টের পর নতুন পরিবর্তনের আশায় সাধারণ মানুষ ভেবেছিল—চাঁদাবাজি কমবে, স্বস্তি ফিরবে জনজীবনে। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। কোথাও কোথাও এই অবৈধ কার্যক্রম আরও বেড়েছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন, রাজনৈতিক সমঝোতা কঠিন; কিন্তু চাঁদাবাজদের মধ্যে সমঝোতা তৈরি হওয়া খুবই সহজ। তার মতে, এক দল সরলে আরেক দল দ্রুত সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয়—যা একটি গভীরতর কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
চাঁদাবাজি এখন শুধু অপরাধ নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটি ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রাজনৈতিক পালাবদলের পরও যারা একটি স্বচ্ছ, সুশাসিত পরিবেশের প্রত্যাশা করেছিল, তারা এখন হতাশ। পরিবহন, হাট-বাজার, টেন্ডার, নির্মাণকাজ, জলমহাল ও বালুমহাল—সবখানেই একই চিত্র।
পরিবহন খাতে প্রতিদিন বিপুল অর্থ হাতবদল হয়। শুধুমাত্র ঢাকার ৫৩টি টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড থেকে দৈনিক আদায় হয় আনুমানিক ২ কোটি টাকার বেশি, যা মাস শেষে দাঁড়ায় ৬০-৮০ কোটি টাকায়। দেশব্যাপী বাস-মিনিবাস খাত থেকেও প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার বেশি অবৈধভাবে তোলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের কাছে প্রকাশ্যে চাঁদা দাবি, অস্বীকার করলে হামলা বা ব্যবসা বন্ধের হুমকি—এসব যেন নিত্যদিনের ঘটনা।
চাঁদাবাজির চালিকাশক্তি হিসেবে মূলত পাঁচ গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা হয়—রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ, কিছু প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং বিচ্ছিন্নভাবে চাঁদাবাজিতে যুক্ত ব্যক্তিরা।
গত ১৫ মাসে বিভিন্ন স্থানে দুই হাজারের বেশি চাঁদাবাজির ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। বড় দল থেকে শুরু করে অপেক্ষাকৃত ছোট সংগঠন—সবখানেই চাঁদাবাজির অভিযোগের ছড়াছড়ি। পরিবহন খাতে চাঁদা দাবি করে হামলা, গাড়ি ভাঙচুর কিংবা রুট বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় কিছু নেতাকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার বা শোকজ করা হলেও চাঁদাবাজি থামার কোনো লক্ষণ নেই।
এনসিপি, বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতার বিরুদ্ধেও চাঁদা দাবি, তদবির-বাণিজ্য, মব হামলা, পরিচয় ব্যবহার করে ক্ষমতা প্রদর্শনসহ নানা ধরনের অভিযোগ উঠছে। তদন্ত চলছে বহু ঘটনার। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়ও একই অভিযোগে গ্রেপ্তার, প্রতিবাদ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা ঘটছে প্রায়ই।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদাবাজির এই বিস্তৃত চক্র ভেঙে দিতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা জরুরি। অন্যথায় চক্র বদলাবে, কিন্তু চাঁদাবাজি থামবে না।
এমবি/এসআর

