চূড়ান্ত পরাজয়ের আগে রাজাকার বাহিনীর পরিকল্পিত বুদ্ধিজীবী হত্যা
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পরপরই জানা যায়, পাকিস্তানি বাহিনী বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের ঘর থেকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর। দুপুরে খাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর বাসায়। তাঁর মা আফিয়া বেগম খাবার আনতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই দরজায় এসে দাঁড়ায় একদল লোক। তারা বলে, “আমাদের সঙ্গে একটু যেতে হবে।” সেদিন আর ফিরে আসেননি মুনীর চৌধুরী। একই দিনে আড়াই মাসের সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে থাকা তরুণ বিজ্ঞানী মো. আমিনউদ্দিনকেও চোখ বেঁধে তুলে নেওয়া হয়। তিনিও আর ফেরেননি। সাংবাদিক নিজামুদ্দীন আহমদকেও সন্তানদের সামনে থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। রশীদ হায়দার সম্পাদিত বাংলা একাডেমি প্রকাশিত স্মৃতি: ১৯৭১ গ্রন্থে এমন আরও বহু শহীদ বুদ্ধিজীবীর শেষ মুহূর্তের বেদনাবিধুর স্মৃতি সংকলিত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পরপরই জানা যায়, পাকিস্তানি বাহিনী বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের ঘর থেকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ঢাকায় অবস্থানরত মার্কিন সাংবাদিক পিটার আর কান তাঁর দিনপঞ্জিতে ১৮ ডিসেম্বর লেখেন, মুক্তিবাহিনী সেদিন বিখ্যাত বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের গণকবরের সন্ধান পায়, যাঁদের স্থানীয় সামরিক বাহিনী জিম্মি করে আগের রাতে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসজুড়েই এভাবে বহু বরেণ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন গোবিন্দচন্দ্র দেব, মুনীর চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লা কায়সার, আলতাফ মাহমুদ, সেলিনা পারভীনসহ আরও অনেকে। এই হত্যাযজ্ঞে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে আলবদর বাহিনীসহ স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীগুলো।
ডিসেম্বরে বিজয় যখন অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। তবে শুধু ঢাকায় নয়, সারাদেশেই চলেছে বুদ্ধিজীবী নিধন। পিরোজপুরে সাঈফ মীজানুর রহমানকে জিপের পেছনে বেঁধে শহর ঘোরানোর পর গুলি করে বলেশ্বর নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। সিলেটে সৈয়দ সিরাজুল আব্দালকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মীর আবদুল কাইয়্যুমকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়—তিনি আর ফেরেননি। মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁসহ দেশের নানা জেলায় একই ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ পর্যন্ত চার দফায় ৫৬০ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর নাম প্রকাশ করেছে। তবে গবেষকদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। শহরকেন্দ্রিক তালিকার বাইরে গ্রাম ও মফস্বলের বহু বুদ্ধিজীবীর নাম এখনো অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।
২০১৩ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান জানান, একাত্তরের আগস্টেই মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়, যা ডিসেম্বরে আলবদর বাহিনী বাস্তবায়ন করে। এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা রাও ফরমান আলীর ডায়েরিতে পাওয়া বুদ্ধিজীবীদের নামের তালিকার কথাও বারবার উঠে আসে।
আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত, মুনীর চৌধুরীর কবর নাটক কিংবা আলতাফ মাহমুদের সুর করা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’—এই সব সৃষ্টিই বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। শহীদ বুদ্ধিজীবীরা শুধু মেধাবী ছিলেন না, ছিলেন বিবেকবান। একটি অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁরা।
জাতির সেই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারানোর ক্ষত আজও বহন করছে বাংলাদেশ। এই ক্ষতি কোনো দিনই পূরণ হওয়ার নয়।
এমবি এইচআর

