ভেনেজুয়েলার তেলভাণ্ডারের দিকে কেন যুক্তরাষ্ট্রের মূল টার্গেট

ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল ও গ্যাস সম্পদের দিকেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কেন্দ্রীভূত—এমন বাস্তবতা আবারও স্পষ্ট হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণায়।

Jan 5, 2026 - 11:35
 0  1
ভেনেজুয়েলার তেলভাণ্ডারের দিকে কেন যুক্তরাষ্ট্রের মূল টার্গেট
ছবি, সংগৃহীত

মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ

ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল ও গ্যাস সম্পদের দিকেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কেন্দ্রীভূত—এমন বাস্তবতা আবারও স্পষ্ট হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণায়। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার পর ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রক্ষমতা ও জ্বালানি খাত এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে দেশটিতে বিপুল বিনিয়োগের কথাও জানান।

মাদুরো প্রশাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও অস্ত্র পাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই তুলে আসছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তবে আটকের পর দেওয়া বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এই অভিযানের পেছনে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলভাণ্ডারই প্রধান লক্ষ্য। তেলের পাশাপাশি দেশটির গ্যাস সম্পদও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় আকর্ষণ।

মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার খনিতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের মজুদ। দেশটির মাটির নিচে প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে মোট মজুদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। অথচ এই বিপুল মজুদের তুলনায় ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন অত্যন্ত কম।

বর্তমানে ভেনেজুয়েলা প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করে, যা বৈশ্বিক দৈনিক অপরিশোধিত তেল সরবরাহের মাত্র শূন্য দশমিক আট শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, এত কম উৎপাদনের পেছনে রয়েছে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা।

প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজেরই যখন বিপুল জ্বালানি মজুদ রয়েছে, তখন ভেনেজুয়েলার তেলের প্রতি এত আগ্রহ কেন। এর উত্তর লুকিয়ে আছে তেলের গুণগত পার্থক্যে। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল হালকা প্রকৃতির, যা ‘সুইট ক্রুড’ নামে পরিচিত। এই তেল মূলত গ্যাসোলিন উৎপাদনের জন্য উপযোগী হলেও অন্যান্য ভারী শিল্প জ্বালানির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল ভারী ও ঘন প্রকৃতির। এই তেল উত্তোলন ও পরিশোধনে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রযুক্তি ও ব্যয়ের প্রয়োজন হলেও এর মাধ্যমে উচ্চমানের ডিজেল, অ্যাসফল্ট, শিল্পকারখানায় ব্যবহারের জ্বালানি এবং ভারী যন্ত্রপাতির জন্য উপযোগী বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ও লুইজিয়ানার মতো রাজ্যে অবস্থিত পরিশোধনাগারগুলো মূলত ভারী অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্যই তৈরি। ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ হালকা তেল এসব পরিশোধনাগারের প্রয়োজন পুরোপুরি মেটাতে পারে না। নিয়মিত পেট্রল ও অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য হয়েই ভারী অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভর করতে হয়।

এই নির্ভরতা কমাতে চাইলে মার্কিন পরিশোধনাগারগুলোকে নতুন করে আধুনিকায়ন করতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন হবে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ। নিকট ভবিষ্যতে এমন ব্যয়বহুল সংস্কারে বড় কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।

কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনের চেয়েও বেশি অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করলেও বাস্তবে ভারী তেলের চাহিদা পূরণে দেশটিকে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করতেই হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত অধিকাংশ হালকা তেল বিদেশে রপ্তানি করা হয়, আর বিপরীতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ভারী তেল আমদানি করতে হয় পরিশোধনাগার সচল রাখতে।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে ভেনেজুয়েলার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কানাডা ও রাশিয়ার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভারী তেলের মজুদ রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভৌগোলিক সুবিধা। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি হওয়ায় পরিবহন ব্যয়ও অন্যান্য উৎসের তুলনায় কম।

সব মিলিয়ে, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পচাহিদা ও অর্থনৈতিক হিসাব—এই তিনটি বিষয়ই ভেনেজুয়েলার তেলভাণ্ডারকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

এমবি এইচআর