ইরানে নজিরবিহীন বিক্ষোভ: পতনের মুখে কি সরকার?

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন দেশটির ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসে এক নতুন ও নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা।

Jan 12, 2026 - 11:07
 0  3
ইরানে নজিরবিহীন বিক্ষোভ: পতনের মুখে কি সরকার?
ছবি, সংগৃহীত

মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন দেশটির ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসে এক নতুন ও নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। দেশজুড়ে বড় ও ছোট শহরে একযোগে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর ইরানি কর্তৃপক্ষ দমন-পীড়নের পথ বেছে নিলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলে আঞ্চলিক উত্তেজনাও বাড়তে থাকে।

ইরানি সরকার পাল্টা হুমকি দিয়ে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ ও মিত্রদের লক্ষ্য করে আঘাত হানতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এই আন্দোলন কি আগের বিক্ষোভগুলোর মতোই দমন হয়ে যাবে, নাকি সত্যিই সরকার পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে ইরান?

আন্দোলনের ব্যাপকতা ও চরিত্র

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর বিস্তার ও তীব্রতা। সমাজবিজ্ঞানী এলি খোরসান্দফার বলেন, ইরানের বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভ শুরুর পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে ছোট ও প্রত্যন্ত শহরগুলোতে—যেগুলোর নাম অনেকেই আগে শোনেননি। অতীতে ২০০৯ সালের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ মূলত বড় শহরের মধ্যবিত্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আবার ২০১৭ ও ২০১৯ সালের আন্দোলন বেশি দেখা গিয়েছিল দরিদ্র এলাকায়।

২০২২ সালে মাহশা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে বিক্ষোভ হয়েছিল, সেটি ছিল তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া বর্তমান আন্দোলন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বড় আকার নিচ্ছে এবং এর গতি থামার লক্ষণ নেই।

অর্থনীতি থেকে শাসনব্যবস্থা

এবারের আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল মূলত অর্থনৈতিক ক্ষোভ থেকে। ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের ভয়াবহ দরপতনকে কেন্দ্র করে তেহরানের বাজার ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমাঞ্চলের দরিদ্র প্রদেশগুলোতে এবং পরে মধ্যবিত্ত শ্রেণিও এতে যুক্ত হয়।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি আন্দোলন দ্রুতই শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয়। রাস্তায় শোনা যায় ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’—এমনকি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনি ও তার সরকারের অপসারণের দাবিও ওঠে।

নেতৃত্বের ইঙ্গিত ও বিকল্পের খোঁজ

২০২২ সালের আন্দোলনে সুস্পষ্ট নেতৃত্বের অভাব ছিল। এবারের বিক্ষোভে সেই জায়গায় কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নির্বাসনে থাকা ইরানের সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বিক্ষোভকারীরা অন্তত একটি বিকল্পের ইঙ্গিত পাচ্ছেন।

তবে অনেকের মতে, পাহলভির প্রতি যে সমর্থনের ছায়া দেখা যাচ্ছে তা রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং ইসলামি শাসনের বাইরে কোনো স্পষ্ট বিকল্প না থাকার হতাশার প্রতিফলন।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

এবারের আন্দোলনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রকাশ্য। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইরানি সরকারকে সতর্ক করেছেন। ২০০৯ সালের আন্দোলনের সময় যুক্তরাষ্ট্র এমন অবস্থান নেয়নি—বরং তখন প্রেসিডেন্ট ওবামার নীরবতা নিয়ে পরবর্তীতে অনুশোচনা করা হয়েছিল।

এ ছাড়া ইরানের আঞ্চলিক অবস্থানও আগের চেয়ে দুর্বল। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের পতন, ইসরায়েলের অভিযানে হেজবুল্লাহর শক্তি হ্রাস এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ভয় কাটিয়ে রাস্তায় নামা

খোরসান্দফারের মতে, এবারের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ভয় ভাঙা। বিশেষ করে নারীরা প্রকাশ্যে বলছেন, দমনমূলক সরকারের ভয় কাটিয়ে রাস্তায় নামাটাই তাদের বড় অর্জন।

এখন প্রশ্ন একটাই—ইরান সরকার কি আগের মতোই এই আন্দোলন দমন করতে পারবে, নাকি এই বিক্ষোভই দেশটির ক্ষমতার কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করবে? উত্তর দেবে সময়ই।

এমবি এইচআর