প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা, স্থবিরতা বাড়ছে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে; সচিবশূন্য পাঁচ বিভাগ

Oct 20, 2025 - 10:57
 0  2
প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা, স্থবিরতা বাড়ছে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে; সচিবশূন্য পাঁচ বিভাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাষ্ট্রযন্ত্রের শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যর্থ হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। একের পর এক পদোন্নতি ও বদলি হলেও সচিবশূন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বেড়েই চলছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনে চলছে পদায়নজট, অনিশ্চয়তা ও ক্ষমতার টানাপোড়েন। প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্তহীনতা, দলবাজি ও ব্যক্তিগত পছন্দ–অপছন্দের কারণে জনপ্রশাসনে সৃষ্টি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা ও অচলাবস্থা।

বর্তমানে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ—এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সচিববিহীন। ফলে দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

পদোন্নতি পেয়েও দায়িত্ব নিতে পারছেন না অনেকে

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিসিএস ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা এস এম শাকিল আখতারকে গত ৩ আগস্ট মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হলেও উপদেষ্টার আপত্তিতে তিনি এখনও দায়িত্ব নিতে পারেননি। ই-মেইলে যোগদানপত্র দিলেও সশরীরে চেয়ারে বসা হয়নি তাঁর।

একইভাবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আব্দুর রহমান তরফদারকেও শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হলেও নানা জটিলতায় দায়িত্ব নিতে পারেননি। পরে তাঁকে সরকারি কর্মকমিশনে বদলি করা হয়।

মাসের পর মাস সচিববিহীন মন্ত্রণালয়

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগে সচিব নেই সাড়ে ছয় মাস ধরে, রুটিন দায়িত্বে আছেন অতিরিক্ত সচিব ইসমাইল হোসেন।
স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগে গত ২৭ আগস্ট সচিব ডা. সারোয়ার বারী অবসরে গেলেও নতুন নিয়োগ হয়নি।
পরিকল্পনা বিভাগের সচিব ইকবাল আবদুল্লাহ হারুন পিআরএলে যাওয়ার পর রুটিন দায়িত্বে আছেন অতিরিক্ত সচিব এস এম রেজাউল মোস্তফা কামাল।
এদিকে বস্ত্র ও পাট সচিব আবদুর রউফ অবসরে গেছেন ১৬ অক্টোবর, এখনো তাঁর স্থলাভিষিক্ত কেউ নেই।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব এহছানুল হককে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বদলি করার পর সেই পদও খালি রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও প্রশাসনবিষয়ক লেখক ফিরোজ মিয়া বলেন, “এটা প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের অদক্ষতা ও দলবাজির ফল। মাসের পর মাস সচিববিহীন মন্ত্রণালয় চলছে, দক্ষ কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেলেও দায়িত্ব পাচ্ছেন না। এটি সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতার পরিষ্কার উদাহরণ।”

অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ও রাজনৈতিক প্রভাব

অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের মাথায়ও প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরেনি। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বিএনপি-জামায়াত ঘরানার কর্মকর্তাদের প্রভাব এবং ক্ষমতার প্রতিযোগিতা প্রশাসনের গতি রুদ্ধ করছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ডিসি নিয়োগ ও বদল নিয়েও আমলাদের মধ্যে হাতাহাতি, এমনকি এক কর্মকর্তাকে ওয়াশরুমে আটকে রাখার ঘটনাও ঘটেছিল।

এছাড়া সচিব নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, এমনকি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বেশির ভাগই “তদন্তে প্রমাণিত হয়নি” বলে দাবি করছে সরকার।

সারসংক্ষেপ

বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের এই অচলাবস্থা দেশের নীতিনির্ধারণ ও উন্নয়ন কার্যক্রমে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। নিয়মিত সচিব না থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, প্রকল্প অনুমোদনে জট, এবং মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে কেন্দ্রীয় দপ্তরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

সরকারি অভ্যন্তরে প্রশ্ন উঠেছে—অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা কবে ফিরবে, আর দক্ষ কর্মকর্তারা কবে মুক্ত হবেন দলীয় প্রভাবের ছায়া থেকে?

এমবি/এসআর