বিশ্ব তাকিয়ে আছে ড. ইউনূসের দিকে

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে দেশের রাজনৈতিক আন্দোলন ও নির্বাচন প্রক্রিয়া–সংক্রান্ত আলোচনায় এখন যতটা আঞ্চলিক নয়, ততটা বিশ্বব্যাপী মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

Oct 31, 2025 - 16:20
 0  2
বিশ্ব তাকিয়ে আছে ড. ইউনূসের দিকে
ছবি, সংগৃহিত

মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে দেশের রাজনৈতিক আন্দোলন ও নির্বাচন প্রক্রিয়া–সংক্রান্ত আলোচনায় এখন যতটা আঞ্চলিক নয়, ততটা বিশ্বব্যাপী মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা বাস্তবতা অস্বীকার না করে পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন এবং জনগণকে সতর্ক করার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে সংকট উত্তরণে নেতৃত্ব দেওয়ার মানসিকতা রাখছেন—এটাই তার অন্যতম বড় গুণ বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন যে আগামী নির্বাচনের পথে দেশের ভিতর-বাইরে অনেক শক্তি নির্বাচন ব্যাহত করার চেষ্টা করবে; সেটা ছোটখাটো হবে না, বড় আকারের চ্যালেঞ্জও আসতে পারে। ওই সভার পরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ পেশ করে। কমিশনের প্রস্তাবনা এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন কবে ও কীভাবে হবে—এই বিষয়গুলো এখন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। বিশেষত কোন ধরণের সুপারিশ গণভোটে রাখা হবে এবং কোনগুলোতে নোট অব ডিসেন্ট বিবেচ্য থাকবে—এসব প্রশ্ন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন জটিলতা সৃষ্টি করেছে।

বহু রাজনৈতিক দল নোট অব ডিসেন্ট বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে বিতর্কিত ও বিশ্বাসঘাতকতাস্বরূপ মনে করছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল এই প্রক্রিয়াকে জাতির সঙ্গে প্রতারণা বলে অভিহিত করেছেন। ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্টের প্রকাশ দ্রুত রাজনৈতিক বিভাজন বাড়িয়েছে বলে সমালোচনাও আছে; অনেকেই বলছেন, কমিশন সমস্যা সমাধানের দিকটায় প্রধান উপদেষ্টার ওপর অধিকাংশ দায়িত্ব ন্যস্ত করে নিজরা নিরাপদ পথ বেছে নিয়েছে।

সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক চিত্র উদ্বেগজনক। পুলিশবাহিনীর কার্যকারিতা জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ; অর্থনীতি রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল; ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অনেকটাই স্থবির; নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সীমিত; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতা বাড়ছে—এই সব মিলিয়ে দেশে একটি ‘গুমোট’ পরিবেশ বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা জাতির মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং তরুণ প্রজন্মের প্রতি উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

এই প্রতিকূল অবস্থা পেরিয়ে দেশের স্বাভাবিক রাজনৈতিক পথে ফেরার একমাত্র উপায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচন—এই অভিমত প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা ও নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে নির্বাচনের আগে ও সময়ে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখা এবং সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক পারস্পরিক সমাধান আনাগোনা—এসবই এখন প্রধান উপদেষ্টার মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

গতকাল দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে, তার মাঝেই প্রধান উপদেষ্টা বৈশ্বিক কোনো সম্মেলনে যাওয়ার কারণে সফর বাতিল করে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে মনোযোগী থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এটিও তাঁর অবিচল অঙ্গীকার ও দায়িত্ববোধের ইঙ্গিত। উপদেষ্টাদের ভূমিকাসহ কয়েকজনের অনেকে বিতর্কিত মন্তব্য প্রতিদিনই কেন্দ্রে আসে; এসব পরিস্থিতিতেও প্রধান উপদেষ্টা ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এবার নির্বাচনের পথে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ তিনি মোকাবিলা করবেন—এক, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যে আনা; দুই, আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করে ভোটযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টি করা; তিন, নির্বাচনের সময় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। এই তিনটি বাধা পার হলেই দেশের সামনে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সুযোগ দেখা যাবে—আর তা ব্যর্থ হলে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা ও আরও বড় রাজনৈতিক বিভাজন দেখা দিতে পারে।

দেশ-বিদেশ থেকে নজর এখন প্রধান উপদেষ্টার ওপর। তার নেতৃত্বে এবং কূটনীতি-নির্ভর সমাধানে কতটা অর্জন সম্ভব হবে—এ প্রশ্নের উত্তরে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। জনগণের মধ্যে এখনও আশাবাদ রয়ে গেছে; তারা বিশ্বাস করে যতক্ষণ ইউনূস আছেন, ততক্ষণ দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ স্বাভাবিক পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এমবি এইচআর