নয়া ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র আগমনধ্বনি: দেশের অর্থনৈতিক ও সার্বভৌমত্বের জন্য বড় সংকট

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাথে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে।

Nov 19, 2025 - 17:40
Nov 19, 2025 - 17:59
 0  9
নয়া ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র আগমনধ্বনি: দেশের অর্থনৈতিক ও সার্বভৌমত্বের জন্য বড় সংকট
ছবি-সংগৃহিত

মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাথে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। যদিও সরকার এই উদ্যোগকে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে উপস্থাপন করলেও, এতে গোপনীয়তা, জরুরি বিবরণ না প্রকাশ এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নানা দিক নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।

ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস ৩০ বছরের জন্য লালদিয়া টার্মিনাল পরিচালনা করবে এবং প্রায় ৫৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে, যেখানে সাইনিং মানি হিসেবে বাংলাদেশ পেয়েছে ২৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এস ২২ বছরের জন্য পানগাঁও টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, যেখানে বিনিয়োগ ৪ কোটি ডলার ও সাইনিং মানি ১৮ কোটি টাকা।

তবে এই দীর্ঘমেয়াদি ইজারা চুক্তি ও গোপনীয়তার মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে যে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দরসহ কৌশলগত সম্পদ বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে, যা এক ধরনের নতুন ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র আগমনকেই মনে করায়। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ভারতের জমিদারি ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যেভাবে ইংরেজরা বাণিজ্যের ছদ্মবেশে রাজ্যশক্তি দখল করেছিল, আজকের এই বন্দর ইজারাও তাই একই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কেবল বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, এটি ভারত-চীন-মিয়ানমারসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। মালাক্কা প্রণালীর মাধ্যমে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের একটি কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এটি বিশ্বমঞ্চে সামরিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। তাই, এই বন্দর বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার পেছনে ব্যবসার বাইরে গভীর ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য লুকানো থাকতে পারে।

চুক্তিতে গোপনীয়তার অভিযোগ, দেশের কৌশলগত সম্পদ বিদেশি কোম্পানির হাতে দিয়ে ভবিষ্যতে তা হারানোর আশঙ্কা, শ্রমিক ও কর্মচারীদের বিরোধিতা, এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি অবজ্ঞা এই প্রক্রিয়াটিকে গণবিরোধী ও অস্বচ্ছ করে তুলেছে। চট্টগ্রাম শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন ইজারা চুক্তি বাতিলের দাবি তুলেছে এবং কঠোর আন্দোলন কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

এদিকে, নৌপরিবহন উপদেষ্টা ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এই চুক্তিগুলো বাস্তবায়নকেন্দ্রিক এবং দেশের ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় বলে দাবি করা হলেও, বিশ্লেষকরা মনে করেন এসব ‘বাণিজ্যিক’ চুক্তি বাস্তবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত স্বাধীকারের ব্যাপক ক্ষতি ডেকে আনবে।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, দেশের স্বার্থের প্রশ্নে গোপনীয়তা এবং দূর্নীতি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে জাতীয় সংলাপ ও স্বচ্ছতার অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। দেশের প্রতিটি বাঙালি নাগরিকের দায়িত্ব এখন এই সংকট বুঝে, দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষায় সচেতন হওয়া।

আবারও মনে করিয়ে দিতে হয় ইতিহাসের সেই ভয়ংকর অধ্যায় — যেখানে অর্থনৈতিক বাণিজ্যের ছদ্মবেশে উপনিবেশবাদের যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল। সেই ইতিহাস যেন আজকের দিনে পুনরাবৃত্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে। তাই এই ‘নয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র আগমনধ্বনিতে দেশের বাণিজ্যিক ও সামরিক নিরাপত্তাকে রক্ষার পাশাপাশি সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সক্রিয় জনসচেতনতা ও ঐক্য আবশ্যক।

এমবি এইচআর