ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে টানাপড়েন: কূটনীতির কঠিন সময়

বাংলাদেশের প্রধান প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে টানাপড়েন ছিল সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কূটনীতির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। যদিও অতীতেও বিভিন্ন সরকারের আমলে ঢাকা–দিল্লির সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা গেছে, তবে গত ১৫ বছরে এই সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতার এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল

Jan 7, 2026 - 11:49
 0  2
ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে টানাপড়েন: কূটনীতির কঠিন সময়
ছবি, সংগৃহীত

মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ

বাংলাদেশের প্রধান প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে টানাপড়েন ছিল সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কূটনীতির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। যদিও অতীতেও বিভিন্ন সরকারের আমলে ঢাকা–দিল্লির সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা গেছে, তবে গত ১৫ বছরে এই সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতার এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে তিক্ততা তৈরি হয়েছে, তা স্বাধীনতার পর নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

অভ্যুত্থানের পর থেকে প্রায় চার মাস ধরে নিয়মিতভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশে লোকজনকে ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) ঘটনা ঘটছে, যা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ বারবার পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও জন-আকাঙ্ক্ষার আলোকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থের ভিত্তিতে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলে আসছে।

গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে কর্মকর্তা পর্যায়ে বৈঠকের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ডিসেম্বরে ঢাকায় দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছরের এপ্রিলে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাক্ষাৎ হলেও সম্পর্কের দূরত্ব কমেনি।

ভারত স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত তারা এই সম্পর্ককে ‘স্বাভাবিক’ পর্যায়ে আনবে না। এর মধ্যেই আইপিএলে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে নিলামে নেওয়ার পর বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের অবনতি আরও প্রকাশ্য রূপ নেয়।

বছরজুড়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একতরফা ও যাচাইবিহীন তথ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, বাংলাদেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারাও ভারতের সমালোচনা করতে গিয়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে।

গত ডিসেম্বরে সম্পর্কের টানাপড়েন আরও বাড়ে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির খুনিদের ভারতে আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর কয়েকটি রাজনৈতিক দল ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচি ও ‘মার্চ টু ইন্ডিয়ান হাইকমিশন’ কর্মসূচির ঘোষণাও দেওয়া হয়, যদিও পুলিশি ব্যারিকেডে তা মাঝপথে আটকে যায়।

এ ছাড়া বিজয় দিবসে ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নামকরণ করা হয় সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিহত কিশোরী ফেলানী খাতুনের নামে—‘ফেলানী এভিনিউ’। এই সিদ্ধান্ত ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন প্রতীকী বার্তা দেয়।

সম্পর্কের টানাপড়েন আরও বাড়ে যখন এনসিপির এক শীর্ষ নেতা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন, যা দিল্লির কাছে ‘প্ররোচনামূলক’ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর জেরে দুই দেশই একে অপরের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে। পাশাপাশি ভারতের উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিক্ষোভের পর বাংলাদেশ সাময়িকভাবে ভারতে ভিসা সেবা স্থগিত করে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান ঘিরে নতুন অস্বস্তি তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত চাইলেও ভারত তাতে সাড়া দেয়নি। বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।

সম্প্রতি ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এর প্রতিবাদে দিল্লি ও আগরতলায় ভিসা ও কনস্যুলার সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্রেও হামলার ঘটনা ঘটে।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিশ্লেষকদের ধারণা, নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বড় ধরনের উন্নতির সম্ভাবনা কম। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, নির্বাচনের আগে সময় সীমিত হলেও রুটিন কূটনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়; সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উভয় পক্ষেরই আরও আন্তরিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

এমবি এইচআর