গণপরিষদ নির্বাচন নিয়ে যত মাথাব্যথা এনসিপির, প্রয়োজনে আন্দোলন
জাতীয় নির্বাচন নয়, গণপরিষদ নির্বাচন নিয়ে যত মাথাব্যথা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)। বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল যখন দ্রুত জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে, তখন এনসিপি গণপরিষদ নির্বাচন নিয়ে প্রয়োজনে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় নির্বাচন নয়, গণপরিষদ নির্বাচন নিয়ে যত মাথাব্যথা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)। বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল যখন দ্রুত জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে, তখন এনসিপি গণপরিষদ নির্বাচন নিয়ে প্রয়োজনে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এনসিপি মনে করছে, দেশের বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থা জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি নয়। গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়ন, রাজনৈতিক কাঠামোর সংস্কার ও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সূচনা সম্ভব। বর্তমান সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থা জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই প্রয়োজন একটি নতুন সংবিধান।
দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা বিভিন্ন সভা-সেমিনার, এমনকি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনেও গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশের নতুন সংবিধান এখন সময়ের দাবি। গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করলে তা সর্বজন গ্রহণযোগ্য হবে। সহজে পরিবর্তন হবে না।
তবে দলটি এ-ও বলছে, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তাদের বাধা নেই। সরকারঘোষিত আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনেও তাদের দ্বিমত নেই। শুধু এর আগে গণপরিষদ নির্বাচন দিতে হবে।
গণপরিষদ নির্বাচন নিয়েই এনসিপির মাথাব্যথা বেশি। এ নির্বাচনের যৌক্তিকতা নিয়ে দলটি মনে করছে, বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ সংবিধানে মৌলিক সংস্কারের দাবি জানিয়ে এসেছে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি, ভোটাধিকার ও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বহু প্রশ্ন রয়েছে। একটি গণপরিষদ নির্বাচন এসব সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি বদলায়। তাই সংবিধানেও সংস্কার দরকার হয়। এনসিপির দাবি অনুযায়ী, বর্তমান সংবিধান সেই গতিশীল বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
গণপরিষদ নির্বাচন কী?
গণপরিষদ নির্বাচন হলো জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক পরিষদ গঠন করা, যার কাজ হবে একটি নতুন সংবিধান রচনা করা। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে একবার এমন একটি গণপরিষদ নির্বাচন হয়েছিল, যার মাধ্যমে দেশের প্রথম সংবিধান রচিত হয়। এনসিপি চাচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া আবার চালু করা হোক, তবে এবার বর্তমান বাস্তবতার আলোকে।
গত রোববার (১৪ সেপ্টেম্বর) জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, এনসিপি মনে করে একটি গণপরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই নতুন সংবিধানে নতুনভাবে লিখিত ধারা, উপধারা ও অনুচ্ছেদের মধ্য দিয়ে আমরা যে সংশোধনী, সংস্কারের বিষয়ে একমত হয়েছি সেগুলো টেকসই করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই ঐকমত্যের জায়গায় পৌঁছাতে হবে।
এনসিপির একাধিক সূত্র জাগো নিউজকে জানায়, গণপরিষদ নির্বাচনের দাবিতে ধীরে ধীরে সোচ্চার হচ্ছেন দলের নেতাকর্মীরা। দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে এর যৌক্তিকতা নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। ধীরে ধীরে জনমত গঠনের মধ্য দিয়ে সরকারকে গণপরিষদ নির্বাচন দিতে বাধ্য করবেন তারা। তবে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতায় সরকার যদি জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোয় তবে এনসিপি আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল নিয়ে রাজপথে আন্দোলন কর্মসূচিতে যাবে।
তবে আপাতদৃষ্টিতে গণপরিষদ নির্বাচন খুব সহজেই আদায় করা যাবে বলে মনে করছেন না তারা। কারণ, বিএনপিসহ বেশ কিছু দল দ্রুত জাতীয় নির্বাচনের দাবি তুলেছে। প্রধান উপদেষ্টা আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। তাই দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে হলে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম হতে পারে শেষ ভরসা। তাই সভা-সেমিনারের পাশাপাশি আন্দোলন-সংগ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
যা বলছেন এনসিপি নেতারা
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, ‘জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে আমরা বলেছি এটা ত্রুটিপূর্ণ ঘোষণাপত্র। ঘোষণাপত্র নিয়ে আমরা অন্ধকারে ছিলাম। সে জায়গায় আমাদের অসন্তোষ আছে। জুলাই সনদ নিয়ে আমাদের অবস্থান একেবারেই স্পষ্ট। ঐকমত্য কমিশনে বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বৈঠকে ১৯টি বিষয় এসেছে। এর মধ্যে দশটি বিষয়ে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। এই দশটি বিষয় কিন্তু অধিক গুরুত্বপূর্ণ।’
‘বলা হয়েছে, কিছু সংস্কার পরবর্তীসময়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিক সংস্কার কোনোভাবে নির্বাচিত সরকারের হাতে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ সংবিধান ‘সুপ্রিম ল’র মালিক জনগণ। সংসদ রাষ্ট্রের একটা উইং, সেখানে সুপ্রিম ল’-কে কীভাবে এ উইংয়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে?’
এনসিপি নেত্রী বলেন, ‘এজন্য আমরা গণপরিষদ নির্বাচনের কথা বারবার বলে আসছি। এর আগেও বাংলাদেশের ইতিহাসে গণপরিষদ নির্বাচন হয়েছে। গণপরিষদ বিতর্ক হয়েছে। তার মাধ্যমে একটি সংবিধান হয়।’
নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, ‘এখন বলা হচ্ছে হঠাৎ কেন আমরা গণপরিষদ নির্বাচন চাচ্ছি। এটা কিন্তু হঠাৎ চাওয়া নয়। আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি বিচার, সংস্কার ও গণপরিষদ নির্বাচন দিতে হবে। সরকারের এ ম্যান্ডেটগুলো ধরে আমরা এগোচ্ছিলাম। কিন্তু সরকার তার ম্যান্ডেট থেকে পুরোপুরি সরে গেছে।’
জুলাই ঘোষণাপত্রের অনেক জায়গায় এনসিপি পিছিয়ে এসেছে জানিয়ে বলেন, ‘এটি আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। কিন্তু সংস্কারের আইনি ভিত্তি দিতে হবে। এটি শুধু নব্বইর তিন জোটের কমিটমেন্ট রূপরেখা যেন না থাকে, সেটি ফেল করে আমাদের যদি আরেকটি গণঅভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে যায় সেটি আমাদের জন্য রাজনৈতিক ব্যর্থতা হবে।’
মনিরা শারমিন বলেন, ‘নির্বাচন ফেব্রুয়ারি কেন ডিসেম্বরে হলেও আমাদের সমস্যা নেই। সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে অবশ্যই একমত হতে হবে। যদি এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিকতা দেখানো না হয় আমাদের আসলে...। সরকারের প্রতি অলরেডি আমাদের এক ধরনের অনাস্থা চলে এসেছে। আমাদের দাবি শুধু নির্বাচন নয়, একটি বড় দলের দাবি শুধু নির্বাচন। যদি এরকম হয় তাহলে নির্বাচন আমাদের কাছে মুখ্য হবে না। আমরা দাবিগুলো নিয়ে জনগণের কাছে যাবো, জনমত গঠনের মাধ্যমে রাজপথে থাকবো।’
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘নতুন সংবিধান ও গণপরিষদ নির্বাচন প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে আমরা গণপরিষদ নির্বাচনের জন্য ওয়ান পার্সেন্টও ছাড় দেবো না।’
পাটওয়ারী বলেন, ‘আমরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিরোধিতা করছি না। আমরা চাচ্ছি সংসদ নির্বাচন হোক, গণপরিষদ নির্বাচনও হোক। এটার জন্য সিম্পোজিয়াম, সেমিনার, রাজপথ থেকে শুরু করে সব কর্মকাণ্ড আমরা করবো।’
যা বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা বলেন, ‘আমার কাছে মনে হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বোঝাপড়ার ঘাটতি আছে। যখন নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়েছে, এটা হঠাৎ করে হয়নি। এটা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা এবং সরকার সিরিজ মিটিং করে ঘোষণা করেছে। প্রথমে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে, এরপর ২৫ সালের শেষের দিকে, এরপর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ঘোষণা এলো।’
তিনি বলেন, ‘এই রাজনৈতিক দলগুলো এখন যে প্রশ্ন তুলছে, তারাও এ প্রক্রিয়ার অংশ ছিল। এটা কনফিউজিং। এনসিপি বা অন্য দলগুলোরও তাদের অবস্থান স্পষ্ট করা জরুরি। তা না হলে তাদের সমর্থকরাও কনফিউজ হবে।’
এই অধ্যাপক বলেন, এখন যে গণপরিষদের কথা বলা হচ্ছে ‘ইট ইজ ঠু লেট’। আমি মনে করি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের আরও সিরিয়াসলি এনগেজড হওয়া খুব জরুরি। যেহেতু নির্বাচনের একটি দিনক্ষণ ঘোষিত হয়ে আছে, নির্বাচন কমিশন অলরেডি কাজ শুরু করেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় অংশ নির্বাচনমুখী কার্যক্রম শুরু করেছে।’
এনসিপি দাবি করছে গণপরিষদ নির্বাচন হয়ে তা পরবর্তীসময়ে সংসদে রূপ নেবে। এটা কীভাবে সম্ভব? এমন প্রশ্নের জবাবে এই অধ্যাপক বলেন, ‘বর্তমান সংবিধানের অধীনে কি এটা সম্ভব? সম্ভব নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের থিওরিটিক্যাল কথা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো চাপ প্রয়োগ করার জন্য এক ধরনের বক্তব্য অনেক সময় দেয়। এজন্য সরকারের উচিত ইমিডিয়েটলি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসা।’
এমবি এইচআর

