দিল্লিতে ‘স্বাধীনভাবে’ চলাফেরা, ২০২৬ নির্বাচনে অংশ নিতে চায় আওয়ামী লীগ: শেখ হাসিনা
বাংলাদেশ থেকে অপসারিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে যদি তার দল আওয়ামী লীগকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ না দেওয়া হয়, তাহলে লক্ষ লক্ষ সমর্থক ভোট বর্জন করবে।
মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশ থেকে অপসারিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে যদি তার দল আওয়ামী লীগকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ না দেওয়া হয়, তাহলে লক্ষ লক্ষ সমর্থক ভোট বর্জন করবে।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ও দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন।
৭৮ বছর বয়সী এই নেত্রী গত বছরের আগস্টে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের নেতৃত্বে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের সময় হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা ত্যাগ করেন। এরপর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ পরিচালনা করছে, যারা ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
দিল্লিতে ‘স্বাধীনভাবে’ বসবাস
২০২৪ সালের আগস্টে সহিংস আন্দোলনের সময় জনতার আক্রমণের মুখে শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে করে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে তিনি দিল্লিতে অবস্থান করছেন।
তিনি জানিয়েছেন, ভারতের রাজধানীতে তিনি ‘স্বাধীনভাবে’ বসবাস করছেন, তবে পরিবারের অতীত ট্র্যাজেডির কারণে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। ১৯৭৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তিন ভাই নিহত হন, যখন তিনি ও তার বোন বিদেশে ছিলেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ একদিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনরায় ভূমিকা রাখবে— সরকারে হোক বা বিরোধী দলে। “এটা আমার বা আমার পরিবারের বিষয় নয়,” বলেন শেখ হাসিনা। “বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে জনগণ, কোনো ব্যক্তি বা পরিবার নয়। সংবিধান ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় ফিরে আসাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
সম্প্রতি দিল্লির লোধি গার্ডেনে তাকে হেঁটে বেড়াতে দেখা গেছে, সঙ্গে ছিলেন দুইজন নিরাপত্তারক্ষী। দেশে ফেরার বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “আমি অবশ্যই ফিরতে চাই, তবে তখনই ফিরব যখন সেখানে বৈধ সরকার থাকবে, সংবিধান বহাল থাকবে এবং প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।”
“আওয়ামী লীগকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না দিলে নির্বাচন বর্জন”
শেখ হাসিনা বলেন, “আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুধু অন্যায় নয়, আত্মঘাতীও বটে। লক্ষ লক্ষ মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে— তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে আপনি কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবেন না।”
গত মে মাসে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি ও যুদ্ধাপরাধ তদন্তের অজুহাতে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে।
তবে শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা আমাদের ভোটারদের অন্য দলকে সমর্থন করতে বলছি না। আমরা এখনো আশা রাখি, বিবেকবোধের জয় হবে এবং আমাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।”
তিনি এও জানাননি, নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বা তার প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কোনো অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় আছেন কিনা।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ও ২০২৪ সালের আন্দোলন
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য প্রশংসিত হলেও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে টানা চতুর্থ মেয়াদে জয়লাভের পর বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে।
দেশের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধাপরাধ আদালত “ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল” গত বছরের ছাত্র আন্দোলনে সহিংস দমন-পীড়নের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার শেষ করেছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিক্ষোভে ১,৪০০ জন নিহত ও কয়েক হাজার আহত হয়েছিলেন, যাদের অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আহত হন। অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনা নিরাপত্তা সংস্থার মাধ্যমে গোপন আটককেন্দ্রে বিরোধী কর্মীদের গুম ও নির্যাতনের তদারকি করেছিলেন। মামলার রায় ঘোষণা হবে ১৩ নভেম্বর।
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শেখ হাসিনা
নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে “রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র” আখ্যা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “এই বিচার একটি রাজনৈতিক নাটক, যেখানে রায় আগে থেকেই নির্ধারিত।”
তিনি আরও বলেন, “আমাকে কোনো যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়নি আত্মপক্ষ সমর্থনের। এটি একটি সাজানো বিচার, যার উদ্দেশ্য আমাকে রাজনৈতিকভাবে নিঃশেষ করা।”
শেখ হাসিনার ভাষায়— “আমি দেশে ফিরব, কিন্তু কেবল তখনই, যখন বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও সংবিধান আবারও প্রতিষ্ঠিত হবে।”
এমবি এইচআর

