কাঠগড়ায় কাঁদলেন এনবিআরের সেই মতিউর, আদালত বললেন, ‘দুদকের জালে এখন হাজার মতিউর’
আসামির কাঠগড়ায় একটি বেঞ্চে তিনি বসে ছিলেন। মুখে তাঁর লম্বা দাড়ি। মাস্ক দিয়ে মুখ ঢাকা। মতিউর যে বেঞ্চে বসে ছিলেন, সেই বেঞ্চের এক প্রান্তে বসে ছিলেন তাঁর প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ। সময় তখন দুপুর ১২টা ১০ মিনিট।

নিজস্ব প্রতিবেদক: গত বছরের কোরবানি ঈদের আগে ছেলের ১৫ লাখ টাকায় ছাগল কেনার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর গ্রেপ্তার এনবিআরের সাবেক সদস্য মতিউর রহমানকে আজ আদালতে দেখা গেল ভিন্ন রূপে।
আসামির কাঠগড়ায় একটি বেঞ্চে তিনি বসে ছিলেন। মুখে তাঁর লম্বা দাড়ি। মাস্ক দিয়ে মুখ ঢাকা। মতিউর যে বেঞ্চে বসে ছিলেন, সেই বেঞ্চের এক প্রান্তে বসে ছিলেন তাঁর প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ। সময় তখন দুপুর ১২টা ১০ মিনিট।
ঢাকার মহানগর দায়রা জজ মো. জাকির হোসেন তখন এজলাসে। তিনি দৈনন্দিন মামলার শুনানি গ্রহণ করছিলেন। আদালতকক্ষে দেখা যায়, মতিউর ও লায়লা মৃদু স্বরে নিজেরা কথা বলতে থাকেন। এর ২৩ মিনিট পর মতিউর রহমানদের দুর্নীতির মামলার শুনানি শুরু হয়।
শুরুতে মতিউরের আইনজীবী ওয়াহিদুজ্জামান আদালতকে বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আমার মক্কেল মতিউর এবং তাঁর স্ত্রী কয়েক মাস ধরে কারাগারে আছেন। তাঁরা ষড়যন্ত্রের শিকার। জামিন দিলে পলাতক হবেন না।’
আইনজীবীর বক্তব্যের পর মতিউর রহমান নিজেই আদালতে কথা বলার অনুমতি চান। একপর্যায়ে মতিউর রহমানের আইনজীবীও মতিউরকে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য আদালতের কাছে মৌখিক আবেদন করেন।
আদালত অনুমতি দেওয়ার পর মতিউর আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে শুরু করেন। মতিউর আদালতকে বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আমি কারাগারে থাকা অবস্থায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর একটি চিঠি পাঠিয়েছি। সেই চিঠিতে আমি জানিয়েছি, কীভাবে আমাকে ফাঁসানো হয়েছে।’
মতিউর রহমানের এ বক্তব্যের পর আদালত বলেন, ‘যখন এটি আদালতে জমা দেওয়া হবে, তখন আমি পড়ব।’
এ সময় মতিউর রহমান তাঁর হাতে থাকা একটি চিঠি আদালতে জমা দেন।
আদালতের কাছে চিঠিটি জমা দেওয়ার পর মতিউর আদালতকে বলেন, ‘মাননীয় আদালত, কাস্টমস কর্মকর্তা থাকাকালে একজন সামরিক কর্মকর্তার রোষানলে আমি পড়ি। সেই কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড নিয়ে সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে খবর প্রকাশিত হয়েছে।’
আদালতে কাঁদতে কাঁদতে মতিউর বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আমাকে যেদিন গ্রেপ্তার করা হয়, সেদিন আমার পিতা মারা যান। পরে আমার মা স্ট্রোক করেন। আমার সংসার তছনছ হয়ে গেছে।’
দুই হাত জোড় করে আদালতের উদ্দেশে মতিউর বলতে থাকেন, ‘মাননীয় আদালত, দুদক চেয়ারম্যান বরাবর আমি যে চিঠিটি দিয়েছি, সেই চিঠি আপনি একটু পড়বেন। আমি আর কিছুই চাচ্ছি না। আমাকে যে শাস্তি দেবেন, আমি সেই শাস্তি মেনে নেব।’
মতিউর রহমানের এ বক্তব্যের পর আদালত বলেন, ‘আপনি আপনার বক্তব্য বলছেন। দুদকের নিশ্চয়ই বক্তব্য রয়েছে। আপনার বিরুদ্ধে সিরিজ অব করাপশনের (একের পর এক দুর্নীতি) অভিযোগ রয়েছে। দুদক সেটি তদন্ত করছে। সত্য জানার জন্য একটি প্রসেসের (প্রক্রিয়ার) মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে সময় লাগবে। সেই সময় পর্যন্ত আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে।’
আদালত আরও বলেন, ‘আপনার বিরুদ্ধে দায়ের করার দুর্নীতির মামলাগুলো তদন্তাধীন। দুদক আপনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছে, সেটি টিকবে কি না, সেটি সময় বলে দেবে। এগুলো ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।’
আদালতের এ কথা শুনে কাঠগড়ায় এনবিআরের সাবেক সদস্য মতিউর রহমান আবারও কাঁদতে থাকেন। হাতজোড় করে জামিনের জন্য আকুতি জানান।

আদালত তখন বলেন, ‘দেয়ার আর সো মেনি ইস্যুজ অব অ্যালিগেশন (অভিযোগের অনেক বিষয় রয়েছে)। দুদক আপনার বিরুদ্ধে এ মামলায় ৫৩ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনেছে। আপনার বিরুদ্ধে আরও অনেক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।’
আদালত যখন এ কথা বলছিলেন, তখন মতিউর কাঁদতে থাকেন। জামিন চেয়ে তিনি বলেন, ‘মাননীয় আদালত, অনেক দিন ধরে আমরা জেলে আছি...।’
তখন আদালত বলেন, ‘দুদক তো শুধু এ মামলা করছে না। দুদকের আরও অনেক মামলা রয়েছে। সেসব মামলা তাঁরা তদন্ত করছে। দুদকের জালে এখন হাজার মতিউর।’
আদালত এ পর্যায়ে মতিউর রহমান ও তাঁর স্ত্রী লায়লা কানিজের জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আদালতের আদেশের পর মতিউরের স্ত্রী লায়লা কানিজকে কাঠগড়া থেকে মহানগর আদালতের নিচতলায় মহিলা হাজতখানায় এনে রাখা হয়।
এর পাঁচ মিনিট পর মতিউরকে আদালতের কাঠগড়া থেকে পুরুষ হাজতখানায় রাখা হয়।
মতিউর রহমানের আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মতিউর বর্তমানকে কিশোরগঞ্জ কারাগারে রাখা হয়েছে। আর তাঁর স্ত্রী লায়লা কানিজকে রাখা হয়েছে কাশিমপুর মহিলা কারাগারে। মামলার শুনানির দিন ধার্য থাকলে কারাগার থেকে তাঁদের আদালতে আনা হয়। কেবল আদালতকক্ষেই দুজনের মাঝেমধ্যে দেখা হয়।
মতিউরের প্রথম স্ত্রীর ছেলে-মেয়ে ও দ্বিতীয় স্ত্রী পলাতক
ছাগলকাণ্ড ভাইরাল হওয়ার পর গত বছরের ১৫ জানুয়ারি গ্রেপ্তার হন মতিউর ও তাঁর স্ত্রী লায়লা কানিজ। এরপর তাঁদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত পাঁচটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি মামলা করেছে দুদক। আর অস্ত্র আইনে মতিউরের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হয়েছে।
দুদক, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মতিউরের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজের ছেলে ও মেয়ে দুজনেই বিদেশে পলাতক। মেয়ে রয়েছেন কানাডায়।
এর বাইরে মতিউরের দ্বিতীয় স্ত্রী শাম্মী আখতার শিবলীও বিদেশে পালিয়ে আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছে। এই শাম্মী আক্তারের ছেলে মুশফিকুর রহমান। এই ছেলে গত বছরের কোরবানি ঈদে ১৫ লাখ টাকায় (প্রাথমিক দর) ‘উচ্চবংশীয়’ ছাগল কেনেন। পরে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল (ছড়িয়ে পড়া) হয়। এর পর থেকে তাঁর বিলাসী জীবনযাপনের নানা তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মতিউরের দ্বিতীয় স্ত্রীর ছেলেও দেশে নেই। সে–ও এখন বিদেশে অবস্থান করছে।
মুশফিকুরের ছাগলকাণ্ডের জেরে আলোচনায় আসেন তাঁর বাবা এনবিআরের সাবেক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা মতিউর রহমান। তাঁর ছেলের দামি ঘড়ি, গাড়ি, আলিশান জীবনযাপন; মতিউর রহমান ও পরিবারের সদস্যদের নামে রিসোর্ট, শুটিং স্পট, বাংলোবাড়ি, জমিসহ নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসতে শুরু করে।
পরে দুদক সেটি অনুসন্ধান করে মতিউর, তাঁর প্রথম স্ত্রী, প্রথম স্ত্রীর ছেলে ও মেয়ে এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা করে। প্রতিটি মামলাই তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে।
দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটার (পিপি) মীর আহমেদ আলী সালাম বলেন, ‘ছাগলকাণ্ডের পর মতিউর রহমান ও তাঁর স্ত্রী–সন্তানদের নামে প্রচুর সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক। ইতিমধ্যে তাঁদের সম্পদ ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন আদালত।’
এমবি এইচআর