টিকলো না ট্রাম্পের ‘যুদ্ধ শেষ’ প্রতিশ্রুতি, গাজার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

গাজায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি একসময় শান্তির আশার আলো জ্বালালেও, কয়েক দিনের মধ্যেই সেই আশায় নেমে এসেছে ঘন অনিশ্চয়তার ছায়া।

Oct 21, 2025 - 16:33
 0  1
টিকলো না ট্রাম্পের ‘যুদ্ধ শেষ’ প্রতিশ্রুতি, গাজার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
ছবি-সংগৃহিত

মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ
গাজায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি একসময় শান্তির আশার আলো জ্বালালেও, কয়েক দিনের মধ্যেই সেই আশায় নেমে এসেছে ঘন অনিশ্চয়তার ছায়া। ইসরায়েল ও হামাসের পাল্টাপাল্টি হামলায় আবারও দগ্ধ হচ্ছে গাজা উপত্যকা, প্রশ্নের মুখে পড়েছে ট্রাম্প ঘোষিত “নতুন মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক ভোর”।

রোববার (২০ অক্টোবর) এক বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, যুদ্ধবিরতি এখনো টিকে আছে। তবে একই সময় ইসরায়েল হামাসের ঘাঁটিতে প্রাণঘাতী অভিযান চালিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। ট্রাম্প দোষারোপ না করে বলেন, “এটি হামাসের কিছু বিদ্রোহী উপাদানের কাজ,” এবং তিনি বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে গাজার সিভিল ডিফেন্সের তথ্যে, সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি “পুনরায় কার্যকর” থাকলেও লঙ্ঘন হলে “কঠোর জবাব দেওয়া হবে।” হামাসের দাবি, তারা কোনো যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করেনি; বরং ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘাত উসকে দিচ্ছে।

সীমিত প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ নাজ্জাল রয়টার্সকে জানান, তাদের প্রতিশ্রুতি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে, যা ভবিষ্যতে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাস্তব অগ্রগতি না হলে পুনর্বিবেচনা করা হবে।

ট্রাম্প গত সপ্তাহে মিসর ও ইসরায়েল সফরে গিয়ে শার্ম আল-শেখে যুদ্ধের অবসান ঘোষণা করেন, তবে মাটির বাস্তবতায় শান্তির কোনো দৃশ্যমান প্রতিফলন ঘটেনি। ইসরায়েল হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাদের শর্ত পূরণ না হলে অভিযান আবার শুরু হবে। হামাসও পুনর্গঠনের নামে দখলকৃত এলাকাগুলোয় পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে।

মানবিক সংকট ও সহায়তা স্থগিত

গাজায় মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। সহায়তা কার্যক্রম স্থগিত থাকায় নিরাপত্তা বাহিনী পুনরায় রাস্তায় নেমেছে, এবং সাম্প্রতিক অভিযানে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

হামাসের অভ্যন্তরীণ অভিযানের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে “সহযোগী” অভিযোগে আটজনকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই কঠোর পদক্ষেপ ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

স্থায়ী শান্তি নাকি সাময়িক বিরতি

ইউরেশিয়া গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য পরিচালক ফিরাস মাকসাদ মনে করেন, “নতুন মধ্যপ্রাচ্য” নামে ঘোষিত শান্তিচুক্তি আসলে একটি “সাময়িক বিরতি” মাত্র। তিনি সিএনএনকে বলেন, “এখনও স্পষ্ট নয়—যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা কাঠামো কেমন হবে, কে গাজা শাসন করবে।”

লন্ডনভিত্তিক কাউন্সিল ফর আরব-ব্রিটিশ আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের পরিচালক ক্রিস ডয়েলের মতে, এই চুক্তি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার রাজনৈতিক সমঝোতা। হামাস এতে ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধি হিসেবে স্বাক্ষর করলেও ভবিষ্যৎ গঠনে তাদের ভূমিকা কার্যত নেই।

তিনি মনে করেন, টেকসই শান্তির জন্য ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি, এবং সব ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর নেতৃত্বে পুনর্নির্মাণই হতে পারে স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি।

ইরান, হিজবুল্লাহ ও আঞ্চলিক উত্তেজনা

বিশ্লেষক মুহাম্মদ শেহাদা বলেন, “চুক্তি বাস্তবায়নে মূল বাধা হলো চাপের ভারসাম্যহীনতা—হামাসের ওপর প্রবল চাপ থাকলেও ইসরায়েলের ওপর তেমন নেই।” তার মতে, হামাস নিরস্ত্রীকরণে অনড়, আর ইসরায়েলও অস্ত্র ছাড়ার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, “হামাস যদি অস্ত্র না ফেলে, আমরা বল প্রয়োগেও তা নিশ্চিত করব।” তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাষা শান্তি নয়, বরং আরও সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অনিশ্চয়তার মধ্যে গাজার ভবিষ্যৎ

বর্তমানে গাজায় যুদ্ধবিরতি থাকলেও স্থায়ী শান্তির কোনো নিশ্চয়তা নেই। পুনর্গঠন, প্রশাসনিক কাঠামো, নিরস্ত্রীকরণ ও ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় অধিকার—এসব মৌলিক প্রশ্নের কোনো উত্তর এখনো মেলেনি।

বিশ্লেষক ক্রিস ডয়েলের ভাষায়, “এখন বলা খুব তাড়াতাড়ি যে মধ্যপ্রাচ্য শান্তির পথে। বরং এটি এক অনিশ্চিত বিরতি—যে বিরতির পর নতুন সংঘাত যে কোনো সময় শুরু হতে পারে।”

গাজার ধ্বংসস্তূপে তাই এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে এক প্রশ্ন—ট্রাম্পের ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ কি সত্যিই শান্তির সূচনা, নাকি কেবল যুদ্ধের আগের নীরবতা?

এমবি এইচআর