১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর: চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধারে সামরিক অভিযান

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের এক উত্তাল অধ্যায়। ওই দিনই শুরু হয় বঙ্গভবনের বিদ্রোহী সেনা অফিসারদের বিরুদ্ধে অভিযান—যার লক্ষ্য ছিল সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধার করা।

Nov 3, 2025 - 15:42
 0  2
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর: চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধারে সামরিক অভিযান
ছবি-সংগৃহিত

মেঘনাবার্তা প্রতিনিধি:

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের এক উত্তাল অধ্যায়। ওই দিনই শুরু হয় বঙ্গভবনের বিদ্রোহী সেনা অফিসারদের বিরুদ্ধে অভিযান—যার লক্ষ্য ছিল সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধার করা। এ অভিযানের পরিকল্পনা করা হয় খালেদ মোশাররফ, শাফায়াত জামিলসহ সেনাবাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ অফিসারের নেতৃত্বে।

ঢাকায় ২ নভেম্বর সন্ধ্যায় পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। মেজর নজরুল ইসলাম, মেজর সাইদ আহমেদ এবং মেজর নাসির—এই তিনজন সাহসী অফিসারকে কুমিল্লা থেকে ডেকে আনা হয়। ১ম ও ২য় ইস্ট বেঙ্গলের সিও ও কোম্পানি কমান্ডারদেরও নির্ধারিত সময়ে ব্রিফ করা হয়। ৪ ইস্ট বেঙ্গলকে রিজার্ভ রাখা হয়। তবে তাদের সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুল হককে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অভিযানের বিষয়ে জানানো হয়নি।

অপারেশন প্ল্যান ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত ও সংক্ষিপ্ত। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩ নভেম্বর রাত দুইটায় বঙ্গভবনে থাকা ১ম ইস্ট বেঙ্গলের দুটি কোম্পানি কাউকে কিছু না জানিয়ে ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আসবে। ২য় ইস্ট বেঙ্গল ও ২২ বেঙ্গল স্থাপন করবে অ্যান্টিট্যাংক মাইন, যাতে বিদ্রোহীদের ট্যাংক বা ভারী যানবাহন ক্যান্টনমেন্ট ছাড়তে না পারে। পাশাপাশি বিমানবাহিনীর দুটি জেট ও দুটি হেলিকপ্টার রকেট সজ্জিত হয়ে ভোরে বঙ্গভবনের আকাশে চক্কর দেবে।

অভিযান সফল করতে ব্যতিক্রমী ভূমিকা রাখেন বিমানবাহিনীর দুঃসাহসী পাইলটরা—স্কোয়াড্রন লিডার লিয়াকত আলী খান বীর উত্তম ও বদরুল আলম বীর উত্তম। মাত্র দেড় ঘণ্টায় তাঁরা যুদ্ধ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। যদিও তৎকালীন বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল তাওয়াব বিদ্রোহীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, তবু পাইলটদের দ্রুত পদক্ষেপে অভিযান অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।

ভোরের পর মিগ জেট ও হেলিকপ্টার আকাশে চক্কর দিতেই বিদ্রোহীরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। সেনানিবাসে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে। সকাল নাগাদ ৪ ইস্ট বেঙ্গল সদর দপ্তরে ভিড় জমায় অসংখ্য অফিসার—যাঁদের অনেকে আগের দিন বিদ্রোহীদের পক্ষে ছিলেন। বিমানবাহিনী প্রধান তাওয়াবকে একপর্যায়ে স্কোয়াড্রন লিডার লিয়াকত আটক করে নিয়ে আসেন, পরে পরিস্থিতি বুঝে খালেদ মোশাররফ তাঁকে স্বাগত জানান।

সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের অফিসারদের উপস্থিতিতে খালেদ মোশাররফ জানান—বিদ্রোহী অফিসারদের দমন ও সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠাই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। উপস্থিত সবাই এতে একমত হন।

সকালের পর শাহবাগ রেডিও স্টেশনে মোতায়েন সেনারা খালেদ মোশাররফের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন, যদিও সারাদিন বেতার সম্প্রচার বন্ধ থাকে। রাত ১১টার দিকে ফারুক, রশিদ, ডালিম, শাহরিয়ারসহ বিদ্রোহী অফিসাররা বিমানযোগে ব্যাংককের উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন।

তবে একই রাতে—২ নভেম্বর দিবাগত গভীর রাতে—ঘটে এক মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনা। প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাকের নির্দেশে বিদ্রোহী অফিসারদের পাঠানো একটি দল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করে বন্দি চার জাতীয় নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে গুলি করে হত্যা করে।

এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর ৩ নভেম্বরের অভিযানে অংশ নেওয়া সেনা অফিসাররা কেউই তখন জানতে পারেননি। তাঁরা পরদিন জানতে পারেন যে দেশটি এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির মধ্যে দিয়ে আবারও ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়েছে।

এমবি এইচআর