শেখ হাসিনা: রাজনীতিতে দীর্ঘতম অধ্যায়ের মালিক; কীভাবে বদলে গেল ভাগ্য

Nov 18, 2025 - 10:35
 0  3
শেখ হাসিনা: রাজনীতিতে দীর্ঘতম অধ্যায়ের মালিক;  কীভাবে বদলে গেল ভাগ্য

মেঘনাবার্তা প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার যাত্রা একদিকে যেমন দীর্ঘ, অন্যদিকে তেমনি নাটকীয় মোড় ও উত্থান–পতনে ভরা। প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত রেখেছেন তিনি—কখনো দলীয় প্রধান, কখনো বিরোধীদলীয় নেত্রী, আবার দীর্ঘ সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

ভারতে স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। সপরিবারে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়া আওয়ামী লীগ নতুন করে সংগঠিত হয়, এবং ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারির একটি সম্মেলনে তাকে দলের নেতৃত্বে আনা হয়। ঘোষণার সময় তিনি ছিলেন ভারতেই; পরে দেশে ফিরে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে দলের ভেতরে সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা এবং নেতৃত্বের স্বাভাবিক গুণাবলি তাকে দ্রুত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেয়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং জনতার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ তার জনপ্রিয়তাকে আরও বাড়িয়ে तोলে।

১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন শেখ হাসিনা। পাঁচ বছর পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন। সরকারের পূর্ণ পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে ২০০১ সালে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে তার দল।

পরে আবারও বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকাকালেই ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলার মুখোমুখি হন তিনি। রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে ২০০৭ সালে জারি হওয়া জরুরি অবস্থার সময় গ্রেপ্তারও হতে হয় তাকে—দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে প্রথমবার।

২০০৮ সালে নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরেন শেখ হাসিনা। দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরই ঘটে বিডিআর বিদ্রোহ, যা দেশের ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়। তার সরকারের আমলে শুরু হয় ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ, যা আন্তর্জাতিক পরিসরেও আলোচনার জন্ম দেয়।

বছরগুলোতে বিভিন্ন আন্দোলন—হেফাজতের ধর্না, ছাত্র আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক, কোটা সংস্কার—দমন নিয়ে সমালোচিত হয়েছে তার প্রশাসন। সমালোচকদের অভিযোগ, দলীয় সংগঠনকে ব্যবহার করে আন্দোলন দমনে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি।

২০২৪ সালে দ্বিতীয় দফায় কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় সরকারবিরোধী জনআন্দোলনে। সহিংসতা, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি এবং ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় দেশজুড়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। অবশেষে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরে তিনি দেশ ছাড়েন এবং ভারতে আশ্রয় নেন।

একসময় ক্ষমতায় নিরঙ্কুশ অবস্থান তৈরি করলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগ তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে নানা অসঙ্গতি ও বিতর্ক আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক চাপের মুখে ঠেলে দেয়।

অন্যদিকে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন তাকে প্রশংসাও এনে দেয়। তবে এসব প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ থেকেছে বরাবরই।

বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধে আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় শেখ হাসিনার ফের রাজনীতিতে ফিরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ কীভাবে বদলায়, তার ওপরই নির্ভর করবে তার রাজনৈতিক পুনরুত্থানের সম্ভাবনা।

এমবি/এসআর