১৯৭১-এর ইতিহাস ভুলিয়ে বিকল্প শক্তি হতে চায় জামায়াত: নূরুল কবীর
জামায়াত ইসলামীর সাম্প্রতিক কার্যক্রম ও তৎপরতা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, দলটি নির্বাচন পেছাতে চায়—এমন মন্তব্য করেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নূরুল কবীর। সম্প্রতি ঠিকানায় খালেদ মুহিউদ্দীন টকশো অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ
জামায়াত ইসলামীর সাম্প্রতিক কার্যক্রম ও তৎপরতা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, দলটি নির্বাচন পেছাতে চায়—এমন মন্তব্য করেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নূরুল কবীর। সম্প্রতি ঠিকানায় খালেদ মুহিউদ্দীন টকশো অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
নূরুল কবীর বলেন, বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নানা দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বৃহৎ অংশ এখনো জামায়াতের মতো রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় দেখতে প্রস্তুত নয়। সে কারণেই জামায়াত জানে, তারা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে পারবে না। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা নির্বাচন প্রলম্বিত করতে চায়।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে ডানপন্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল কিছু ব্যক্তি এবং প্রশাসনের ভেতরে তাদের সমর্থক থাকায় জামায়াত ডি-ফ্যাক্টোভাবে ক্ষমতার সুবিধা নিতে চাইছে। এ সময়টাকে ব্যবহার করে তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের আরও দমন করতে আগ্রহী। নির্বাচন যত দেরি হবে, তাদের জন্য সুবিধাও তত বাড়বে।
নূরুল কবীর দাবি করেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকেও তিনি জানতে পেরেছেন—জামায়াতের কর্মকাণ্ড ও তৎপরতার ধরন দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা নির্বাচন পেছানোর কৌশল নিচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সরকার গঠনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ না থাকলেও তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনা একটি পুরোপুরি রাজনৈতিক কাজ—এখানে রাজনৈতিক দিগদর্শন, অভিজ্ঞতা ও সংবেদনশীলতার ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা প্রসঙ্গে নূরুল কবীর বলেন, ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই গ্রামীণ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াটা ছিল একটি বড় ভুল। রাষ্ট্র পরিচালনার সময় ব্যক্তিগত ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি ভবিষ্যতে তার জন্য দায় হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নিজের ওপর হামলার প্রসঙ্গে নূরুল কবীর বলেন, তার ওপর হামলায় শিবির সংশ্লিষ্ট লোকজন জড়িত ছিল। তবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মামলা করার অনুরোধ পেলেও তিনি তা করেননি। কারণ এটি তিনি ব্যক্তিগত ইস্যু হিসেবে দেখেন না। তিনি বলেন, সংগঠিত অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে কথা বললে হামলার ঝুঁকি থাকাটাই স্বাভাবিক।
তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াত রাজনৈতিকভাবে বিরোধিতা করার সাহস না দেখিয়ে তাকে ‘আওয়ামী লীগ’ আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করেছে, যা তাদের মুনাফেকির আরেকটি উদাহরণ।
জামায়াতের বিরুদ্ধে তিনটি মূল অভিযোগ তুলে ধরে নূরুল কবীর বলেন—
এক, তারা ঐতিহাসিকভাবে মুনাফেকি করে এসেছে।
দুই, ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে অপব্যবহার করছে।
তিন, ইসলাম ও জামায়াতকে একাকার করে উপস্থাপন করছে।
তিনি বলেন, ইসলাম মূলত জালেমের বিরুদ্ধে এবং মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়। অথচ ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে সংঘটিত নিপীড়নের পাশে দাঁড়িয়েছিল। সেই ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও তারা কীভাবে নিজেদের ইসলামের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি হিসেবে দাবি করে—সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
নূরুল কবীর আরও বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই বিভিন্ন সময় ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করেছে, যার ফলে ধর্ম ও গণতন্ত্র—দুটোরই ক্ষতি হয়েছে। তবে জামায়াত ইসলাম ও রাজনৈতিক দলকে একাকার করে উপস্থাপন করে আরও বড় ক্ষতি করছে।
তিনি বলেন, জামায়াত নিজেদের বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে এবং জনগণের কাছে ‘পরীক্ষা’ দেওয়ার কথা বলছে। কিন্তু ১৯৭১ সালেই তারা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে—যখন দেশের মানুষ অস্তিত্বের লড়াইয়ে ছিল, তখন তারা নিপীড়কের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
এমবি এইচআর

