বিদেশি অপারেটরের দীর্ঘমেয়াদি গোপন চুক্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর, বাড়ছে জাতীয় উদ্বেগ
মেঘনাবার্তা প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলো দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। রপ্তানি–আমদানি, রাজস্ব সংগ্রহ ও পণ্য পরিবহনের গতিশীলতার মাধ্যমে যে প্রবৃদ্ধির চাকা ঘুরছে, তার বড় অবদান এসব বন্দর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত হওয়ায় তৈরি হয়েছে তীব্র উদ্বেগ। ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও বন্দর–সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা—এভাবে নিয়ন্ত্রণ বিদেশি অপারেটরের হাতে চলে গেলে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মাশুল বাড়ার ঝুঁকিও দেখা দিতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালের মধ্যে পাঁচটির ইজারা ইতোমধ্যে বিদেশি কোম্পানির হাতে গেছে বা চুক্তির প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শুধু জেনারেল কার্গো বার্থ ও চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল এখনো বন্দর কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করছে। এর বাইরে লালদিয়া চর কনটেইনার টার্মিনাল, পানগাঁও নৌ টার্মিনাল, এনসিটি, বে টার্মিনালের বিভিন্ন ধাপ এবং পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের পরিচালনা বিদেশিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বা আলোচনা চলছে।
বন্দর–সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব চুক্তির বেশির ভাগই হয়েছে গোপন প্রক্রিয়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদি শর্তে। বিশেষ করে লালদিয়া চর টার্মিনালের চুক্তি ঘিরে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। ৩০ থেকে ৪৮ বছর মেয়াদি এসব চুক্তিতে মাশুল, শুল্ক ও রাজস্ব বণ্টন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জনগণের কাছে প্রকাশ করা হয়নি বলেও দাবি সংশ্লিষ্টদের। অনেকেই বলছেন, এত দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দিলে ভবিষ্যতে বিদেশি অপারেটররা যেকোনো সময় ফি বাড়িয়ে দিতে পারে, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে আমদানি–রপ্তানি ব্যয় ও সাধারণ ভোক্তার ওপর।
শ্রমিক সংগঠনগুলো বিষয়টিকে ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, সরকারের তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তের ফলে কৌশলগত স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে বিদেশিদের হাতে চলে যাচ্ছে, যা দেশের শ্রমবাজার ও বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে মশাল মিছিল, সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এনসিটি ও সিসিটি বিদেশিদের হাতে গেলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব দেশের বাইরে চলে যাবে—এমন দাবি তুলছেন শ্রমিক নেতারা।
অন্যদিকে ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ মনে করে, বিদেশি বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা এলে আধুনিক যন্ত্রপাতি বাড়বে এবং টার্মিনাল পরিচালনায় গতি আসবে। এর ফলে খালাস ও হ্যান্ডলিং বেড়ে রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক উভয়ই উপকৃত হতে পারেন। তবে তারা এও মনে করেন, চালু টার্মিনালগুলো হস্তান্তরের আগে স্পষ্ট নীতিমালা ও জাতীয় স্বার্থ যাচাই প্রয়োজন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মানে উন্নত বন্দর গড়ে তুলতে বিদেশি অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোই উদ্দেশ্য, এবং জাতীয় স্বার্থ কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তবে বন্দর ব্যবহারকারীদের একাংশ এখনও মনে করছেন, স্বচ্ছতা ছাড়া এমন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে এনসিটি ও সিসিটি রক্ষার দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকরা ৪০ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে সরকারকে সতর্ক করেছেন। দাবি না মানলে বৃহত্তর কর্মসূচিরও ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
এমবি/এসআর

