শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস: ‘জাতিকে ব্যর্থ করাই ছিল স্বাধীনতাবিরোধীদের লক্ষ্য’
বাঙালির শোষণ–বঞ্চনা থেকে মুক্তির সংগ্রামে বুদ্ধিভিত্তিক মনস্তত্ত্ব গঠনে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন, জাতির সেই সূর্যসন্তানদের স্মরণে রোববার পালিত হচ্ছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস।
মেঘনাবার্তা প্রতিনিধিঃ
বাঙালির শোষণ–বঞ্চনা থেকে মুক্তির সংগ্রামে বুদ্ধিভিত্তিক মনস্তত্ত্ব গঠনে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন, জাতির সেই সূর্যসন্তানদের স্মরণে রোববার পালিত হচ্ছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস।
একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাত থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়জুড়েই পাকিস্তানি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। তবে বিজয়ের প্রাক্কালে এই হত্যাযজ্ঞ ভয়াবহ রূপ নেয়। এ কাজে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করে এ দেশীয় দোসর রাজাকার ও আল-বদর বাহিনী।
ডিসেম্বরের মধ্যভাগে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয় যখন অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন রাজাকার ও আল-বদরের সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনী দেশের প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। উদ্দেশ্য ছিল—স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে, দেশকে মেধাশূন্য ও পঙ্গু করে দেওয়া।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিকসহ বহু খ্যাতিমান বাঙালিকে নিজ নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে। শরীরে নিষ্ঠুর নির্যাতনের চিহ্নসহ তাঁদের লাশ পাওয়া যায় মিরপুর ও রায়েরবাজার এলাকায়, যা পরে বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিত হয়।
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ৫৪তম বার্ষিকীতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন ও বুদ্ধিভিত্তিক পরামর্শ প্রদানে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে তিনি সব শহীদ বুদ্ধিজীবী ও সূর্যসন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, “১৯৭১ সালের এ দিনে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ও তাদের দোসররা নির্মমভাবে হত্যা করে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। বুদ্ধিজীবীরা একটি জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম রূপকার। মুক্তবুদ্ধির চর্চা, সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশের মাধ্যমে তাঁরা একটি জ্ঞাননির্ভর সমৃদ্ধ জাতি গঠনে ভূমিকা রাখেন।”
তিনি আরও বলেন, “পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা হানাদার বাহিনী জাতিকে মেধাশূন্য করার হীন উদ্দেশ্যে ঢাকাসহ সারাদেশে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়।” এ হত্যাকাণ্ডকে জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “স্বাধীনতার ঊষালগ্নে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারানোর ক্ষত বাংলাদেশ আজও বহন করে চলেছে।”
অন্যদিকে, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর বাণীতে বলেন, “পরিকল্পিত নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে থাকা বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করে একটি ব্যর্থ জাতিতে পরিণত করাই ছিল স্বাধীনতাবিরোধীদের মূল উদ্দেশ্য।” তিনি বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীরা একটি গণতান্ত্রিক, উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ গড়ার কাজ শুরু করেছে, যা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহায়ক হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে জাতীয় কর্মসূচির পাশাপাশি সারাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করছে। সকাল ৭টার পর রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্য ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধারা মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
দিবসটি উপলক্ষে সংবাদপত্রে বিশেষ নিবন্ধ ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ, জেলা–উপজেলা পর্যায়ে আলোচনা সভা এবং বেতার ও টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হচ্ছে। এ ছাড়া সকল ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। দিবসের তাৎপর্য রক্ষায় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এলাকায় মাইক বা লাউডস্পিকার ব্যবহার না করার অনুরোধ জানিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
এমবি এইচআর

